নিবন্ধন : ডিএ নং- ৬৩২৯ || রবিবার , ২৫শে আগস্ট, ২০১৯ ইং , ১০ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২৩শে জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

ভালোবাসার মন্দিরে !

ভালোবাসার মন্দিরে !

ছেলেবেলায় বাবাকে দেখেছি রাজনীতি করতে ৷ তবে আজকের মত ঢাকঢোল পিটিয়ে নয় ৷ অনেকটা আড়ালে , নিরবে নিভৃতে ৷ রাজনীতি করেছেন নিজের জন্য , মনের খোরাক হিসেবে ৷ ১৯৮৬ সালের কথা , নির্বাচন সামনে ৷ বাবা ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছেন , আমরা তখন রুপগঞ্জের ইছাপুরার “ছনী” গ্রামে থাকতাম ৷ বাবা শখ করে এখানে এসে একটি বাড়ি করেছিলেন ( পরের পর্বে বাড়ী নিয়ে লিখবো )৷ গ্রামের লোকজন আমাদের মোড়ের বাড়ী বলেই চিনত ৷ গ্রামের অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত দিনমজুর ৷

পেটনীতি তাদের বড় নীতি ৷ অনাগত ভয় , কুসংস্কার , জ্ঞান ও যুক্তির বাইরে তাদের বসবাস ৷ অন্য জেলা থেকে আগত কোন প্রতিবেশীকে তারা ভীনদেশী মনে করতো ৷ অর্থাৎ নিজ ভূখন্ডের বাইরের মানুষ ৷ এই হলো সেখানকার পরিবেশ ৷ বাবা নীজ উদ্যোগে আওয়ামিলীগ পদপ্রাথিকে সহায়তা করবেন বলে মনোস্হীর করলেন ৷

১১সামান্য একজন ব্যবসায়ী ৷ বিশাল পরিবারে তিনিই একমাত্র কর্মক্ষম মানুষ ৷ সংসার নামক রেলগাড়িটির চালক ৷ বাবা না থাকলে মাকে ছেলেপুলে নিয়ে পথে বশতে হবে ৷ সুতরাং আমাদের পরিবারের জন্য বাবার ভূমিকা বিশাল , বাবাই সবকিছু ৷বাবা মনস্থির করেছেন র্নিবাচনে এ এলাকা থেকে যিনি প্রতিদ্দন্দিতা করছেন , তাকে জয়যুক্ত করাবেন ৷ এ দেশ হবে সোনার দেশ ৷ স্বপ্নের দেশ ৷

তিনি নির্বাচনী প্রচারনার জন্য কাজ করছেন ৷ দিনরাত অবিরত ৷ নাওয়া খাওয়া ভুলেগেছেন ৷ জনমত তৈরি করতে প্রতিদিন খাওয়ানো হচ্ছে খিচুড়ী ৷ বাড়ীর সামনের উঠোনে রান্না করা হচ্ছে ৷ বড় তামার হাড়িতে ৷ একেক দিন একেক পরিমানে ৷ কোন দিন চার , কোনদিন তিন পাতিল ৷ মানুষ বুঝে কথা ৷ বেশী মানুষের সমাগম হলে বেশীকরে রান্না হয় ৷ সারি সারি চেয়ার পাতা ৷ সামনে মন্চ ৷ সেখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে সভা সমাবেশ ৷ জনসংযোগে নিযুক্ত করা হলো আমাদের বড় দুই বোনকে ৷ চৌদ্দ পনের বছরের দুই তরুনী ৷ বাবার ইচ্ছেকে বাস্তবায়িত করতে কাজ করে চলছে মাঠে ৷ গ্রামের প্রতিটি ঘরে যাচ্ছে তারা ৷ কথা বলছে দলের পক্ষ হয়ে ৷ একেক মানুষের একেক রকম কথা শুনছে ৷

কেউ কেউ বলছে শেখের বেটিকে ভোট দিলে দেশ ত্যাগ করতে হবে ৷ কেউ বলছে দেশ ভারতের কাছে বিক্রি হয়ে যাবে , কেউবা আশা দিচ্ছে ৷ তবে সত্য না মিথ্যা বোঝার উপায় নেই ৷

২২আমার বোনেরা তাদের সাধ্যমত চেষ্টা করলো মানুষকে বুঝাতে ৷ যিনি একটি দেশকে নির্মান করেছেন ৷ সৃষ্টি করেছেন ৷ দেশের জন্য জীবন দিয়ে গেছেন স্বপরিবারে ৷ তার দল ৷ তার কন্যা ৷ কি করে একটি দেশকে বেচে দিতে পারে ?

এগুলো হলো স্বাধীনতা বিরোধীদের পক্ষে মিথ্যাচার ৷ গ্রামের সাধারন সহজ সরল নিরক্ষর মানুষেরা ঠিক বুজেছিলোকিনা জানিনা ৷ নির্বাচন শেষ হলো , আমাদের বাড়ীতে চলছে ইট পাটকেল ঢিল ছোড়া ৷ সামনের উঠোনের ল্যাম্পপোষ্টের বাতিটি ভেঙ্গে ঘুড়িয়ে দেয়া হলো ৷ ঘুড়িয়ে দেয়া হলো মন্চ ৷ বাড়ির বাশের বেড়া ৷

বাইরে বিজয়ী দলের শ্লোগান হলো “হাসিনালো হাসিনা তরা কথায় নাছিনা ৷ তোর কথায় নাইচ্চা দেশটা দিলাম বেইচ্চা ৷ ” আমরা বাড়ির ভিতর ৷ মা ভয়ে অস্হির ৷ একবার দরজায় কাছে যাচ্ছে আর আসছে ৷

জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে আর দুরত পাঠ করছে ৷ আল্লাহকে ডাকছে ৷ তারা যেন আমাদের বাড়ির ভেতরে না ঢুকে ৷ মারধোর না করে ৷ ভাংচুর না করে ৷

৩৩খিচুড়ি খাওয়ার প্রতিদান তারা দিয়েছিলো , বাড়ির ভেতরে হামলা হলোনা ৷ আমার বাবার গায়ে হাত তুলেনি ৷ তারপর থেকে বাবার মধ্যে একরকম পরিবর্তন এলো ৷

বাবা কষ্ট পেলেন ৷ তার মন ভেঙ্গে গেলো ৷ তিনি প্রতক্ষ্য রাজনীতি থেকে সরে এলেন ৷ ব্যাবসায়ে লোকশান হলো ৷ তিনি অর্থহীন হয়ে গেলেন ৷
নব্বইয়ের দশকে গ্রামের বাড়িটি বিক্রী করে চলে এলেন শহরে ৷ নিজের পুরানো ঠিকানায় ৷ আবার মনদিলেন নিজের ব্যাবসায় ৷ দিন ফিরে এলো ৷

১৯৯৬ সাল ৷ বাবার উত্তেজনা , সারারাত নির্ঘুম সময় কাটে ৷ টিভির খবরে চোখ ৷ হাতে কাগজ কলম ৷ বাবা নির্বাচনের ফলাফল কাগজে লিখছেন ৷ আমরাও জেগে আছি ৷ আমি তখন রাজনীতি বুজিনা তেমন ৷ শুধু বাবার আনন্দটুকু বুঝতে পারছিলাম ৷ আমাদের বাসায় একটা উৎসব উৎসব পরিবেশ ৷

মামা অফিস শেষ করে সরাসরি চলে এলেন আমাদের বাসায় ৷ বাবার কিছু পুরানো বন্ধুরাও ছিলেন ৷ ড্রইংরুম ভরপুর, হৈচৈ চলছে ৷ আওয়ামী লীগ কোন আসনে জয়লাভ করলেই বাবা , মামা চিৎকার করে উঠছেন ৷ সরকারীভাবে ফলাফল ঘোষিত হলো , আওয়ামী লীগ জয়ী হলো ৷ বাবা আনন্দে দিশেহারা ৷ আমরাও আনন্দ করছি ৷ সকলের আড়ালে বঙ্গবন্ধুর এক নিবেদিত সৈনিক ৷ যিনি যৌবন হতে পৌড় বয়স অবধি নির্বিশেষে ভালোবেসেছেন একজন মানুষকে ৷ স্বপ্ন দেখেছিলেন তার আর্দশে পরিচালিত হবে দেশ৷ বাবার সেই স্বপ্ন পুরনহলো অবশেষে ৷ তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার বিপদ মুক্তি কামনা করে গোপালগঞ্জেরে টুঙ্গিপাড়ায় “ পগল সংঘের” আয়োজনে নভেম্বরের ২৬/২৭ তারিখ আয়োজন করলেন এক মিলাদ মািফলের ৷

৪৪সাধারন মানুষের তাকে পাগল হিসেবে দেখতেন , উপাধীটি তারাই দিয়েছিলেন ৷ সেই থেকে এক শ্রেনীর মানুষের কাছে উনি “পাগলা ” ৷ আর আমাদের পরিচয় হলো পাগলার মেয়ে ৷

হক পাগলা ৷ যদিও তার সুন্দর একটি নাম ছিলো “ রুহুল আমিন” । কেউ কেউ আদর করে ডাকতেন রুহুল আমিন সাহেব । বিশেষ করে বাবার ব্যাবসায়ী বন্ধু মহলে এ নামেই তিনি সুপরিচিত ছিলেন ৷ আর গ্রামে হক পাগলা ৷ তিনি গেলেন টুঙ্গিপাড়ায় , কাঁদলেন বঙ্গকন্যার বিপদমুক্তি কামনায় ৷

প্রিয় বাবা , বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাা ভালো আছেন , হাজারও ষড়যন্ত্রের ভিতর দিয়েও তিনি বিপদমুক্ত আছেন এবং এই দেশের আপামর জনতার ভালোবাসায় তিনি ভালো থাকবেন সব সময় ৷ বাবা , আপনার মত এরকম আরো অনেক নিবেদিত মানুষ আছেন জননেত্রীর পিছনে ,যারা উনার সদা মঙ্গল কামনা করেন ৷

এক সময়ে , টুঙ্গীপাড়ায় গিয়ে বাবা পেলেন বঙ্গবন্ধুর মাজারে মসজীদের ইমাম সাহেবকে ৷ ইমাম সাহেবের আমন্ত্রনে বাবা গিয়েছিলেন তার বাড়িতে ৷ দেখেছিলেন তার জীবনচিত্র ৷ ভাঙ্গা জরাজিনর্ণ ঘরের চাল ৷ একটু বৃষ্টিতে পানি পরে ৷ তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন ৷ নির্মিত হলো নতুন টিনেরচাল ৷

নতুন ঘর ৷বাবা মৃত্যুর আগপর্যন্ত নিয়মিত সহায়তা করলেন ইমাম সাহেবকে ৷ মৃত্যুর দিন পাঁচেক আগে ডেকে পাঠালেন ইমাম সাহেবকে , তিনি তওবা পরালেন বাবাকে ৷ ১৯৯৮ এর তেশরা এপ্রিল ৷ তিনি চলে গেলেন , আর ফিরবেননা কোনদিন ৷

আবার একটি জাতীয় নির্বাচন আসন্ন । আবার উত্তেজনা , চারিদিকে শেয়ালেরা গোপনা সভা ,মিটিং করছে ৷ তারপরও ভোর হবে , লাল সূর্য উঠবে ৷ আমরা একটি সতেজ ভোর দেখার অপেক্ষায় থাকলাম ৷

লেখিকা : শাহানাজ শাহীন
সাউথ কোরীয়া ; ২৭-১০-২০১৮

Comments

comments

এমন আরো খবর:

Web developed by: AsadZone.Com

Send this to a friend