নিবন্ধন : ডিএ নং- ৬৩২৯ || রবিবার , ১৮ই আগস্ট, ২০১৯ ইং , ৩রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৬ই জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

‘ডাক্তার সাহেব আগে তো আমাকে সেক্স করতে দিন’

‘ডাক্তার সাহেব আগে তো আমাকে সেক্স করতে দিন’

মাকসুদা আক্তার প্রিয়তি

গত বছর দশ দিনের মাথায় যখন আবার বাংলাদেশে দ্বিতীয়বারের জন্য যাই, তখন আমার প্রচন্ড ব্লিডিং শুরু হয়। আমার পিরিয়ড শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় আবার কেন পিরিয়ড শুরু হয় ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি। আমি ভেবেছি এক সপ্তার মধ্যে আবার থেমে যাবে। এদিকে দ্বিতীয় বার বাংলাদেশে আসার আমার কিছু কারণ রয়েছে, কিছু কাজ এর প্ল্যান ও সিডিউল করা হয়েছে। দশ দিন প্রচুর পরিমাণে ব্লিডিং হচ্ছে আর আমি বিছানা থেকে উঠতে পারছি না। আমি দেশে গেলে খুব চেষ্টা করি কোন ডাক্তারের কাছে যেন আমাকে না যেতে হয়। ব্লিডিং যেহেতু থামছে না, এবার ডাক্তারের কাছে যাবার পালা। আমার শরীর ততদিনে বেহাল অবস্থা। উঠে দুই মিনিট বসা শক্তি নেই। আমি তখন ফার্মগেট আমার ভাইদের বাসায়। আমার মনে হলো আর দেরী করা ভালো হবে না, ডাক্তারের কাছে যাওয়া জরুরী এখন। ভাবি বললো আলরাজীতে এক গাইনী ভাল ডাক্তার আছে ওইখানে তোমার জন্য সিরিয়াল নিয়ে নিই। ভাবিরা ভালো ডাক্তার এর নির্ণয় করার জন্য কোন মাপকাঠি ব্যবহার করেন আমার জানা নেই। আমি আমার অর্ধ চালু ঝিমঝিম মার্কা মস্তিষ্ক নিয়ে বললাম,’’ আচ্ছা যেখানে আমাকে লাগামহীন অপেক্ষা করতে হবে না সেখানেই নিয়ে যান।’’

গেলাম সেই ডাক্তারের কাছে, গিয়ে দেখি উনার রোগীর অভাব নাই। ওয়েটিং রুম রোগীতে টুই টুম্বুর করছে। আমি ভাবীর দিকে চোখ দিতেই ভাবী আমার চোখের ভাষা বুঝে ফেলে বললেন, ‘’ তোমার সিরিয়াল বারো নাম্বারে, চিন্তা করোনা।’’ ভাবি চিন্তা করতে না করা সত্ত্বেও আমি চিন্তা করছি সামনের এগারোজন রোগীকে গড়ে বিশ মিনিট লাগলেওতো দুইশো বিশ মিনিট অর্থাৎ প্রায় চার ঘণ্টা লাগার কথা। আমি ঐ অংক কষে মনে হয় আরেকটু অসুস্থ হয়ে পড়লাম।

আমি আশে-পাশে রোগীদের দিকে তাকাই, মাশাল্লাহ দিলে তাদের চোখে কোন বিরক্তিও নেই, ক্লান্তিও নেই। মনে হচ্ছে, উনারা নিজেদের আল্লাহর ওয়াস্তে সঁপে দিয়েছেন। আমি নিজেকে বোঝ দেয়ার চেষ্টা করলাম যে , ওরা ( ডাক্তার) রোগীদের দেখার একটি সম্ভাব্য (এপরক্স) সময় দিয়ে দেয় না। উনারা ধরেই নিয়েছেন সেই সময় দিয়ে লাভ হবে না। কারণ কেউ টাইম মেইনটেইন করবে না। ডাক্তার স্বয়ং নিজেও জানেনা তিনি কখন এসে পৌঁছাবেন তার চেম্বারে। রাস্তায় প্রচুর জ্যাম এরকম একটা সুন্দর ছুতো তো আছেই। রোগীরা না হয় আরো একঘন্টা বেশি বসে থাকবে, তাতে কার কি আসে যায়? উনারা এটা ভুলে যান যে, অনেক রোগীর ওই ট্রাফিক জ্যাম পার করেই এসেছেন। ডাক্তার সাহেবার আসার কথা ছিল বিকেল পাঁচটায় , উনি এসে পৌঁছিয়েছেন সন্ধ্যা সারে ছয়টায় । আমার ক্যালকুলেশন করা সময়ের সাথে আরো দেড়ঘন্টা যোগ হলো। আমি মনে মনে এই ভেবে শান্তনা দিচ্ছি যে, এখানে হয়তো আমার চেয়ে বেশি কেউ অসুস্থ আছেন, যার কিনা হয়তো আমার পরে তার সিরিয়াল।

এই দেখেন আমি এখনো আমার মূল ঘটনায় যেতে পারিনি। আমি জানি উপরের ঘটনাগুলো আপনাদের সবার কাছেই খুব পরিচিত এবং তা সবাই স্বাভাবিকভাবেই নিয়ে নিয়েছেন বা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। আমি শুধু ঘড়ি দেখছি আর প্রহর গুনছি।

ডাক্তার আসার পর, দেড় ঘন্টার মধ্যে আগের এগারোজন রোগীকে দেখা শেষ করে আমার ডাক আসলো। আমি হতবাক, কিন্তু আমারতো খুশী হওয়ার কথা। ডাক্তারের চেম্বারে দরজায় ঢুকতে ঢুকতে আমি গড়ের অংক কষে ফেললাম। প্রতিটা রোগীকে ডাক্তার গড়ে সময় দিয়েছেন মাত্র আট মিনিট।

ভাবী সহ আমি ভিতরে ঢুকলাম। আমার পড়নে ছিল ভাবির একটা সালোয়ার কামিজ, স্বাভাবিক ভাবেই ঢিলা- ঢোলা। ডাক্তার সাহেব আমার মুখের দিকে না তাকিয়েই উনার মোবাইলের দিকে দেখতে দেখতে বললেন, ‘’বলুন, কি সমস্যা আপনার?’’ আমি সমস্যার কথা বলা শুরু করলাম। তিনি তখন ও আমার দিকে তাকাননি। আমি লক্ষ্য করছি উনার দুই পা দুলছে, মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে মোবাইলটি কোন জুইতে রাখবেন, কি রাখবেন না ,সামনে রাখবেন না পাশে রাখবেন, তার মহা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এরপর উনার লেখার ডাক্তারি প্যাডটি কাছে টা্নলেন । এর পুরো ঘটনা ঘটে যাচ্ছে ত্রিশ থেকে চল্লিশ সেকেন্ডের মধ্যে বা আরও বেশী। এরপর তিনি আমার মুখের দিকে তাকালেন। আমার সমস্যার কথা গুলোর মধ্যে থামিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,’’ আপনি কি বাইরে থাকেন?’’ আমি জ্বি বলে আবারো শুরু করবো ঠিক তখনই উনি আমাকে বললেন, আল্ট্রা সাউন্ড না করে কিছু বলতে পারছি না , আপনি উপরে এই টেস্টটি আগে করুন, তারপর আসুন। আর আমি আপনাকে আপাতত ব্লিডিং বন্ধ করার জন্য মেডিসিন দিচ্ছি, সেটি খাওয়া শুরু করুন।

রাত তখন প্রায় আট টা। আলট্রাসাউন্ড করতে হবে পরেরদিন সকালে খালি পেটে তবে পেট ভর্তি পানি নিয়ে।

*পরেরদিন আলট্রা সাউন্ড এর দিন*
যথাযথ ভাবে গেলাম। টিশার্ট আর জিন্স পরা। ডাক আসতেই ধন্যবাদ জানিয়ে শুয়ে পড়লাম। আরেক ডাক্তার সাহেবা আমার স্ক্যানিং শুরু করলেন। একে তো চরম পর্যায়ে প্রসাবের চাপ , তার মধ্যে তিনি চেপে চেপে স্ক্যানিং করছেন। আমি যে আয়ারল্যান্ড এ এতবার ২ডি আলট্রা সাউন্ড করেছি এমন অত্যাচার অনুভব করিনি আর দেশেতো ৪ডি আলত্রাসাউন্ড। আচ্ছা যাই হোক, ডাক্তার সাহেবার আমার প্রতি প্রথম বক্তব্য, ‘’ আপনি কি বাঙালী ?’’ তো আমার মনে প্রশ্ন হল, আমি বাঙালী কি বাঙালী না উনার যদি সন্দেহ থাকে তাহলে বাংলায় জিজ্ঞেস করে কেন? বললাম জ্বি। তিনি কয়েকটা প্রশ্ন করলেন, লাস্ট কবে পিরিয়ড হল কবে শুরু হল ইত্যাদি। এর মধ্যে উনার স্ক্যানিং শেষ করতে করতে আমাকে জানালেন , আমার পেটের মধ্যে নাকি অবশিষ্ট প্রোডাক্ট পাওয়া গিয়েছে। বাকি টুকু আমার ডাক্তার জানাবেন। আমি বুঝলাম তিনি উনার মেডিক্যাল এর ভাষায় আমাকে কিছু বলছেন, বাট যেটাই বলুক না কেন আমার চোখ কপালে , পেট এর মধ্যে আবার কি পাওয়া গেলো? আমি রীতিমতো প্যানিকিং।

ডাক্তার বিকালে বসবেন । সারাদিন উদ্বিগ্নে কেটেছে। বিকালে রিপোর্ট নিয়ে আসলাম ডাক্তারের কাছে হাজির হলাম।

ডাক্তার সাহেব রিপোর্ট দেখে প্রথমেই যে কথাটি আমাকে বললেন আমার হার্ট দুর্বল থাকলে নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক করতো। উনি জানালেন আমার মিসক্যারেজ (বাচ্চা নষ্ট) হয়েছে যার জন্য ব্লিডিং হচ্ছে। আমাকে ইমেডিয়েটলি হাসপাতলে ভর্তি হতে হবে , পেট ক্লিন করার জন্য।

পাশে আমার ভাবী বসা। আমি একটা গ্ল্যান্স দেই ভাবীর দিকে। উনার মুখ শক্ত, অনুভূতি বোঝা যাচ্ছে না।
আমার মাথায় তখন রক্ত টগবগ করছে কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রাখার তুমুল চেষ্টা করছি।
আমি ,’’ ডাক্তার হ্যাং অন, আমি তো সেক্স ই করিনি প্রেগন্যান্ট হবো কিভাবে?’’
ডাক্তার,’’ আপনি বলেছেন আপনার দুই বাচ্চা আছে।’’
-তো?
-তো, আপনি স্বামীর সাথে থাকেন না?
-আমি কখন বললাম আমার স্বামী আছে?
-স্বামী তাহলে কোথায় থাকে?
-কখন বললাম আমার স্বামী আছে? (আবারো জিজ্ঞেস করলাম)
-স্বামী ছাড়া বাচ্চা হল কিভাবে ?
– স্বামী ছাড়া বাচ্চা হওয়া যায়না পৃথিবীর কোন বইতে আছে?
স্বামী ছাড়া বাচ্চা হলে আপনার বাচ্চা নষ্ট করেন কিভাবে? ( আমার তখন রগ একটা ছিঁড়ে গিয়েছে)

ডাক্তার সাহেবা তখনও পা দুলাচ্ছেন আর ভাবীর দিকে এক পলক তাকালেন , একটু আমতা আমতা করে বলছেন, ‘’আপনার ভাবীকে একটু বাইরে যেতে বলবো? কিছু প্রাইভেট কথা আপনার থাকতেই পারে।’’

ডাক্তারের এই ভাস্ব্য শুনে আমি তখন কিংকর্তব্যবিমুঢ়। উনারা সত্যি পরাশুনা করেই তো ডাক্তার হয়েছিলেন? তিনি এতো কিছু বলার পর এখন এই কথা ভাবছেন? আমি বললাম, ‘’যা বলার উনার সামনেই বলুন, আমার প্রাইভেট কিছু থাকলে নিশ্চই উনাকে সাথে আনতাম না।’’
ডাক্তার ইনিয়ে বিনিয়ে বলছেন, ‘’ না মানে, আপনার কি কোন গোপন বয়ফ্রেন্ড আছে? থাকে না অনেকের? কত কিছুই তো হয়।’’
উনার বলার ভঙ্গিমা দেখে আমার মাথায় বাজ পরলো মনে হলো। কান দিয়ে ধোঁয়াও বের হচ্ছিলো মনে হয়।
আমি নিজেকে সামলে আবারো ডাক্তারকে বললাম, ‘’ আমার কারোর সাথে শারীরিক সম্পর্ক হয়নি, আর আপনি আমাকে প্রেগন্যান্ট বানিয়ে দিচ্ছেন? ‘’
ডাক্তার,’’ আমি বানিয়ে দেইনি, আপনার রিপোর্ট বলছে।’’
আমি,’’ আপনি তো ইউরিন টেস্ট ও করেননি , কিভাবে সিউর হলেন? আলট্রা সাউন্ড এ তো অন্য কিছু ও আসতে পারে?’’
ডাক্তারের মুখের যেই ভাব ভঙ্গি করছিলো তা আমার পক্ষে আর নেয়া সম্ভব ছিল না। উনার ভাবটা এমন যে, ভাবীর সামনে আমি নিজেকে তুলশি পাতা ধোয়া এক মেয়ে প্রমাণ করার জন্য এতো চেষ্টা করছি আর উনি আমার কড়া কথাগুলো মুখ বুজে সব সহ্য করছেন।
Oh, Hello , I am not তুলশি পাতা ধোয়া woman but I know my body.
আমি চলে আসি, দ্বিতীয়বারের জন্য একবারও ভাবিনি আমাকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া দরকার।
পরবর্তীতে আয়ারল্যান্ড এ ফেরত আসলাম , চেক করালাম এবং উনারা এতো ঘাটাঘাটি করে কিছুই খুজিয়া পাইলেন না।

বুইঝলেন কিছু ব্যাপারটা ??

বিঃদ্রঃ সব ডাক্তাররা কিন্তু একরকম নয়।

লেখক: বৈমানিক, মডেল ও মিস আর্থ ইন্টারন্যাশনাল

Comments

comments

এমন আরো খবর:

Web developed by: AsadZone.Com

Send this to a friend