নিবন্ধন : ডিএ নং- ৬৩২৯ || রবিবার , ২৫শে আগস্ট, ২০১৯ ইং , ১০ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২৩শে জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

সক্রেটিস কখনোই সরাসরি কাউকে কিছু শেখাতেন না

সক্রেটিস কখনোই সরাসরি কাউকে কিছু শেখাতেন না

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী
সক্রেটিসের শিষ্য ও অনুসারীদের কাছ থেকে জানা যায়, সক্রেটিস কখনোই সরাসরি কাউকে কিছু শেখাতেন না। বরং তিনি তরুণ-বৃদ্ধ, উচ্চ-নিম্ন সকল শ্রেণির মানুষের সাথে আলাপে মত্ত হয়ে যুক্তি দিয়ে তাদের মতামত ও চিন্তার অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করতেন।

দুটি দৃঢ় নীতির উপর তার জীবনদর্শন প্রতিষ্ঠিত, ১. প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনভাবেই খারাপ কিছু না করা এবং ২. ভালমন্দের চেতনাহীন ব্যক্তিই কেবল এ নীতির বিপক্ষে কাজ করতে পারে। প্রথম নীতিটির অনুসরণ তিনি অনেক ক্ষেত্রেই করে দেখিয়েছেন। আর্গিনুসে যুদ্ধের (Arginusae, খ্রিস্টপূর্ব ৪০৬) পর এথেনীয় পরিষদের অধিকাংশ সদস্য চাচ্ছিলেন বিনা বিচারে নৌসেনাপতিদের মৃত্যদণ্ড দিতে। কিন্তু সেই পরিষদের সভাপতি ছিলেন সক্রেটিস। প্রতিদিন এ সভার সভাপতি বদল হতো। তিনি নানা হুমকি অগ্রাহ্য করেছেন, তবুও সে প্রস্তাবকে ভোটের জন্য বিবেচনা করেন নি।

খ্রিস্টপূর্ব ৪০৪ সালে এথেন্সের গণতন্ত্র উৎখাত করে তথাকথিত ‘ত্রিশ স্বৈরাচার’ শাসন কায়েম হয়। তারা প্রত্যেককে তাদের অনাচারের দোসর করে নিতে চেয়েছিল এবং যেকোন নির্দোষ জনগণকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়ে রেখেছিল। সে সময়েও সক্রেটিস তাদেরকে অমান্য করেন, যা ছিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সার্বভৌম জনগণের ইচ্ছাকে অমান্য করার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলাকালীন সময়েও তিনি বলতেন একজন রাষ্ট্রনায়কের রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা বিবেচনায় আনতে হবে। সেটি না করে তার বাকপটুতায় প্রভাবিত হয়ে যাওয়াটা প্রচণ্ড অযৌক্তিক।

সাধারণত একজন বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিক কখনোই হাতুড়ে চিকিৎসকের কাছে যায় না, বরং সবচেয়ে ভাল চিকিৎসককে খুঁজে বের করে। সবচেয়ে মৌলিক অসঙ্গতিটি সক্রেটিস দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন। তা হল, মানুষ অন্যের মাঝে যে ব্যাপারগুলো ভাল বলে বিবেচনা করে (যেমন নিজের ক্ষতি করেও অন্যের উপকার করা) তা তারা নিজেদের জন্য ভাল মনে করে না। আর নিজেদের জন্য যেটাকে ভাল মনে করে তা অন্যের মধ্যে দেখলে তারা ঘৃণা করে। তার এসব চিন্তাপদ্ধতি ও নীতির প্রচারের ফলে তিনি তরুণদের মাঝে তুমুল জনপ্রিয় হন। অন্যদিকে রাজনীতিকদের চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন। ত্রিশ স্বৈরাচারের শাসনামল অনেক ছোট ছিল। তাদের অনেক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সক্রেটিসের অনুসারী ছিলেন বলে সে সময়ে সক্রেটিস তাদের রোষানল থেকে বেঁচে যান।

এথেনীয় সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতার যুগ থেকে পেলোপনেশীয় যুদ্ধে স্পার্টা ও তার মিত্রবাহিনীর কাছে হেরে যাওয়া পর্যন্ত পুরো সময়টাই সক্রেটিস বেঁচে ছিলেন। পরাজয়ের গ্লানি ভুলে এথেন্স যখন পুনরায় স্থিত হওয়ার চেষ্টা করছিল তখনই সেখানকার জনগণ একটি কর্মক্ষম সরকার পদ্ধতি হিসেকে গণতন্ত্রের সঠিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করেছিল। সক্রেটিসও গণতন্ত্রের একজন সমালোচক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাই অনেকে সক্রেটিসের বিচার ও মৃত্যুটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি নীতিভ্রষ্টতা ও তরুণদের বিপথগামী করার মতো মিথ্যে অভিযোগে অভিযুক্ত হন এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। মূলত নৌসেনাপতিদের বিচারের সময় গণমতের বিরুদ্ধে আপোসহীন অবস্থান নেয়ার ফলাফল হিসেবে তাঁকে এহেন করুণ পরিণতিবরণ করতে হয়।

Comments

comments

এমন আরো খবর:

Web developed by: AsadZone.Com

Send this to a friend