নিবন্ধন : ডিএ নং- ৬৩২৯ || রবিবার , ১৮ই আগস্ট, ২০১৯ ইং , ৩রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৬ই জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

পেশায় শিক্ষক আর নেশায় কাব্যসুধা মাধুকরী শোয়াইব জিবরান

পেশায় শিক্ষক আর নেশায় কাব্যসুধা মাধুকরী শোয়াইব জিবরান

আবদুল্লাহ আল মোহন

১.
নব্বই দশকে আত্মপ্রকাশকারী কবিদের অন্যতম নামটিই শোয়াইব জিবরান। পেশায় শিক্ষক আর নেশায় কাব্যসুধা মাধুকরী। আজ আমাদের অনেকের প্রিয় রসিক মানুষ, কবি শোয়াইব জিবরান-এর জন্মদিন। রচনায় নিজস্ব ছাপচিত্রের, মুদ্রাদোষের দারুণ পক্ষপাত‘দুষ্ট’ ভাবুক তিনি। শব্দ নিয়ে খেলার প্রবল ঢেউয়ের ভাবের ঘোরের মধ্যে থাকা, এদেশের নদীর নামের মাঝেও কবিতা খুঁজে পাওয়া, নিজের ছায়ার পিছে নিরন্তর হাঁটা প্রিয় কবির জন্মদিনে জানাই শুভেচ্ছা নিরন্তর, বিনম্র শ্রদ্ধা। শুভ জন্মদিন কমলকুমার মজুমদার বিশারদ, কবি ড. শোয়াইব জিবরান, আমার শোয়াইব ভাই। তিনি আমার প্রিয় ‘মহুয়া মাতাল’ স্বর্গের কাছাকাছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসের স্বপ্নবান বড় ভাই, চিন্তন স্বজন, বান্ধবও বটে। ‘অমরত্ব’ কবিতার চরণ স্মরণে আসে, ‘তাদের কাপড়ে পুরে পুঁতে ফেলছে লোকে/ ছাইভষ্ম বানিয়ে উড়িয়ে দিচ্ছে শ্মশানে/এইসব হুমকীর সামনে অমরতার সাধনা করছি, দেবা।’

২.
একাধারে শিক্ষক, গবেষক ও শব্দ-সচেতন কবি ড. শোয়াইব জিবরান, শোয়াইব ভাইয়ের নাম মনে পড়লেই স্মৃতিতে ভাসে আরেকজনের ছবি ও কবিতা। তিনি বিশ্বখ্যাত কবি ও চিত্রকর কাহলীল জিবরান, তাঁর ‘প্রফেট’ এবং ‘শয়তান’ গ্রন্থ দু’টি। আর তখনই ভীষণ বিপদে পড়ি, বিব্রত হই, কোন গ্রন্থনামটি আসলে শোয়াইব ভাইয়ের জীবনের জলছবি হিসেবে ভাববো, ভাবতে ভাবতে আমার বেলা চলে যায়, ভাবনার খেলা আর শেষ হয় না, ফলে নিদারুণ অবহেলায় তুলে নেই তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থটি ‘কাঠ চেরাইয়ের শব্দ’, পাতায় পাতায় মনোনিবেশ করে জব্দ হই নিজেই নিজের কাছে, তাঁর শিল্প বৈভবময় কল্পনার নদীতে নেমে কাব্য সুধারসে স্নাতক হয়ে।কারণ নদী ও নারী নয়, নদী ও কবিতা রূপকল্প হয়ে ভীষণ ঢেউ তোলে পাঠকের মনে, ঘোরের জ্বরে আক্রান্ত হই, হতে হয়।তখনই টের পাই কবির নিজস্ব কাব্যভাষাকে, তাঁর নিজস্ব স্বাক্ষরটিতে চোখ আটকে যায়। একান্ত আপন ভাষায় কাব্যমাঠে সোনালি স্বপ্ন ফসল ফলানো কৃষক হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৯৬ সালে তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘কাঠ চেরাইয়ের শব্দ’তেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, আসছেন স্বতন্ত্র কাব্যভাবনা নিয়ে।’কাঠ চেরাইয়ের শব্দ’ প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা একাডেমির ‘তরুণ লেখক প্রকল্প’র অধীনে। সেই কবি শোয়াইব জিবরান ‘ছায়াবন’ কবিতায় বলছেন যেমনটি, ‘দৃশ্য গেথেঁ গেথেঁ চলেছ, দৃশ্যশিকারী।/দৃশ্যেও অর্ন্তগত বেদনা হতে, বর্শার ফলা চুঁইয়ে/পড়েছে ফোটা ফোটা, ছায়া।’

৩.
লেখবার মতোন অসংখ্য স্মৃতির রঙধনু মনের আকাশে উঁকি দিচ্ছে। কোনটা রেখে কোনটা বলি। তাঁর সাথে দেখা হওয়া মানেই হাসিমাখা মুখের, একমাত্র ‘সুপুরুষের’ জীবনানন্দময় অকপট সম্ভাষণ-স্বীকার-উচ্চারণ, ‘মোহন, তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি’। ভাইয়েরর মমতায়, বন্ধুত্বের গভীরতায়, চিন্তনচর্চার সহযাত্রায় তিনিও আমার পরম স্বজন। তাঁর সাথে ভিন্নমত প্রকাশ করা যায়, যৌক্তিক হলে মেনে নিতেও দ্বিধা করেন না অপরের বক্তব্য-কথন। প্রায় সিকি শতাব্দী ধরে তাঁকে চিনি, জানি, তাঁর সাথে পথ চলা। তবে অনিয়মিত, ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’ জাতীয়। সুতরাং স্মৃতির চলিঞ্চু মেঘমালা আমাদের পরস্পরের জীবন-মনে প্রতিনিয়তই ছায়াপাত করছে। ২০১৬ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার শাহবাগের সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার চত্বরে জাতীয় দেয়াল পত্রিকা উৎসব ও প্রতিযোগিতা-২০১৬ অনুষ্ঠানের অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সাথে আড্ডা-মুক্ত আলোচনার আলোকিত স্মৃতি খুউব বেশি মনে পড়ছে। যেমনটি শোয়াইব ভাইয়ের জন্মদিনের আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে তাঁকে ‘স্বর্ণদিবস স্বর্ণরজনীর বন্ধু’ শিরোনামের স্মৃতির শ্রদ্ধাচরণে স্মরণ করেছিলে কবি সরকার আমিন। আমার মতোন অনেকের মনের কথাটিই তিনি লিখেছেন, ‘কবি শোয়াইব জিবরান আমার সেই স্বর্ণদিবস-রজনীর বন্ধু। কত কত দিন কেটেছে আমাদের চাঁদের সন্ধানে। ‘প্রখর রোদ্দুরে চাঁদ কই পাইবা’- এই অদরকারি প্রশ্ন কেউ তুলে নি। নিশিতে আমরা আরো ঘন অন্ধকার চেয়েছি। হেসেছে আমাদের সীমিত দেশলাই। ড. শোয়াইব জিবরান কবি, অধ্যাপক, সম্পাদক, নানা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। কিন্তু আমাদের কাছে শোয়াইব ‘আমাদের বন্ধু’।

৪.
কোন প্রকার ভনিতা ছাড়াই তাঁর সাথে শিল্পকলার নানা মাধ্যম নিয়ে তর্ক করা যায়, সেটা রুচির দারুণ খরা নিয়ে কিংবা শিক্ষা ব্যবস্থার নানা অনাচার, অব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্রভাবেই আলোচনায় ঝড় তোলা যায়। ভাবের অনুভবে তিনি ‘আপাদমস্তক’ কবি হলেও শিক্ষা নিয়ে আমাদের দু’জনারই অসম্ভব আগ্রহ থাকায়, মানহীন শিক্ষা ও অপব্যবস্থা নিয়ে অনায়াসে আলোচনা করা যায়। সংস্কৃতি এবং সভ্যতার প্রবল অসুখ, তীব্র সংকট নিয়ে বাদানুবাদ ঘটানো যায়। তাতে আমাদের প্রীতির সম্পর্কের আকাশে বিন্দুমাত্র মেঘ জমে না। তাঁর সাথে আলাপনে প্রতিটি বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করতে সচেষ্ট থাকেন, আলোচনাকালে আমার মতোন ‘ত্যাড়া’ সহতার্কিককেও সংশ্লিষ্ট বিষয়টির অর্ন্তনিহিত, গভীরের তাৎপর্য বোঝাতে তৎপর থাকেন অসীম ধৈর্য্য সহকারে।‘কবিতা কেন লিখেন— একজন কবি এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে বাধ্য কি না? যদি বাধ্য নন— তো কেন? আর হোন যদি— আপনার প্রতিও একই প্রশ্ন; কেন লিখেন কবিতা?’ মনে পড়ছে এই প্রশ্নের জবাবে যেমনটি তিনি বলেছিলেন, সেই কথাগুলি, ‘একখণ্ড পুরিষকে বা একটি গোলাপকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় গন্ধ কেন ছড়াও? সে কী বলবে? কেননা, সেটি সে ইচ্ছে করে ছড়ায় না। ওটি তার সত্তার অংশ। কবিতাও আমার সত্তার অংশ। না লিখে পারি না। ছেড়ে দেয়ার চেষ্টা করেছি। ভেবেছি কী হয় এসব লিখে। আরও সম্মানজনক অনেক কিছু আছে করার। লাভ হয়নি। সিফিলিস রোগের মতো ফিরে ফিরে আসে। গোপন প্রেমিকার মতো কবিতা ফিরে ফিরে আসে। সাড়া না দিয়ে পারি না গো!’

৫.
বর্তমানে বাংলা কবিতার পাঠক, কবিতার বিরুদ্ধে জনবিচ্ছিন্নতা ও দুর্বোধ্যতার নানা অভিযোগ আর কবির কি পাঠকের রুচির সাথে আপোষ করে কবিতা লেখা উচিৎ-এমনতর প্রশ্নে অকপটে তিনি বলতে পারেন, ‘চারুশিল্প আম পাবলিকের জিনিস না। এটার জন্য শিল্পবোধ জন্মাতে হয়। এক একটি লেখা এক একটি লেবেলের পাঠকের জন্য। যিনি নজরুলের কবিতার ভক্ত তার কাছে জীবনানন্দ দাশের বিড়াল কবিতাটিকে দুর্বোধ্য মনে হওয়াই স্বাভাবিক। যিনি শরৎচন্দ্র বা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে অভ্যস্ত তার কাছে কমলকুমার দুরূহ হওয়াটাই স্বাভাবিক। এখন এ দায় আমরা লেখকের উপর চাপাতে পারি না। পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য নাজেল হওয়া ধর্মগ্রন্থগুলোকে আমার অনেক হেয়ালিপূর্ণ মনে হয়। কই এ জন্য আমি তো ঈশ্বেরকে দোষারোপ করতে যাইনি। ওটা বুঝতে হলে আলেম হতে হবে। কবিতার পাঠক কারা? আমরা আর মামুরা। মানে আমরা আমরা! নিজেরা লিখি নিজেরাই পড়ি। ভাইরে, গুপ্তশাস্ত্র চর্চা করিতেছি…।’

৬.
কবি, লেখক গবেষক, শিক্ষাতত্ত্ববিদ শোয়াইব জিবরান ১৯৭১ সালের ৮ এপ্রিল মৌলভীবাজার জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। প্রখ্যাত সুফিসাধক আযমত শাহ্ তাঁর পূর্বপুরুষ বলেই জানি। শোয়াইব জিবরানের লেখাপড়া মৌলভীবাজার জেলার কালীপ্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয়, সিলেট এম.সি. কলেজ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। উচ্চতর ডিগ্রি,পাঠ ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সুকতাই তাম্মাতিরাত ওপেন ইউনিভার্সিটি, তাইল্যান্ড ও কুইন’স ইউনিভার্সিটি, কানাডা থেকে। পেশাগত জীবন শুরু জাতীয় সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা দিয়ে। তিনি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, শিক্ষক হলেও এক সময় কাজ করেছেন জাতিসংঘ শিশু তহবিলের শিক্ষা পরামর্শক হিসেবে। পারিবারিক জীবনে শোয়াইব জিবরানের ‘অর্ধেক আকাশ’ সুলতানা জেসমিন, আমার প্রিয় জেসমিন আপা ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে সরকারি কলেজে কর্মরত আছেন। কন্যা এথিনা আহমেদ এবং পুত্র আহমেদ জায়সী জিবরান শিক্ষা জীবন যাপন করছে।

৭.
শোয়াইব জিবরানের প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে- কাঠ চেরাইয়ের শব্দ (১৯৯৬), বাংলা একাডেমী, দুঃখ ছেপে দিচ্ছে প্রেস (২০০৩), মঙ্গলসন্ধ্যা, কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাসের করণকৌশল (২০০৯), বাংলা একাডেমী, উঠানগুচ্ছ উঠান জুড়ে (২০১০), শুদ্ধস্বর, কমলকুমার চরিতম্ (২০১০), শুদ্ধস্বর, বিষয়ঃ কবিতা কথা ও শিক্ষা (২০১১), ধ্রুবপদ, বার্ড এন্ড ডাস্টস ফ্রম দ্য ইস্ট (২০০৯), স্বাতন্ত্র্য উল্লেখযোগ্য। শিক্ষা বিষয়ক গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- শিক্ষার শত বছরঃ রামমোহন থেকে নজরুল (২০০৯), শিক্ষাচিন্তা, রবীন্দ্র শিক্ষাভাবনা সমগ্র(২০১২), সংবেদ, কর্ম সহায়ক গবেষণা (২০০৯), শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বাংলাশিক্ষণ (২০০৯), শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক শিক্ষা ও শিশুর ক্রমবিকাশ (২০০৯), শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষায় যোগাযোগ ও প্রযুক্তি(২০০১), বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, উচ্চশিক্ষাব্যবস্থাপনা(২০০১), বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, বাঙালির শিক্ষাচিন্তা (বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, নয় খণ্ড, চারুপাঠ ( জাতীয় শিক্ষাক্রমের ৬ষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক),জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, সপ্তবর্ণা ( জাতীয় শিক্ষাক্রমের ৭ম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক),জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, সাহিত্য কণিকা ( জাতীয় শিক্ষাক্রমের ৮ম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক),জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, রলাঁ বার্থের ‘দি ডেথ অব দ্য অথর’ (২০১৭), গবেষণা গ্রন্থ- ‘শিক্ষা পরিভাষা’ (২০১৭)। শোয়াইব জিবরানের সম্পাদিত পত্রপত্রিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য শব্দপাঠ (১৯৯২), শিক্ষাচিন্তা (২০০৯), ঊর্ম(১৯৮৭), মুক্তকপোত (১৯৮৮), লোকায়ত বাংলা (১৯৮৯)।আর যে সকল সংকলনগ্রন্থে স্থান পেয়েছে শোয়াইব জিবরানের রচনা, তার মধ্যে রয়েছে- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও সৈয়দ শামসুল হক সম্পাদিত, দুই বাংলার শ্রেষ্ঠ কবিতা, মডেল পাবলিশিং হাউস, কলিকাতা,১৯৯৭, জয় গোস্বামী ও রফিক আজাদ সম্পাদিত, দুই বাংলার কবিতায় মা, মডেল পাবলিশিং হাউস, কলিকাতা,১৯৯৭, মাহবুব কবির সম্পাদিত, নব্বই দশকের কবিতা, লোক, ঢাকা, ১৯৯৯, সমীর রায় চৌধুরী সম্পাদিত, পোস্ট মডার্ণ পোয়েট্রি, হাওয়া,কলিকাতা, ২০০৩। শোয়াইব জিবরানের পাওয়া পুরস্কারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- মুক্তধারা একুশে সাহিত্য পুরস্কার, আব্দুল মান্নান চৌধুরী পদক।

৮.
শিক্ষা আমার সবসময়ের প্রিয় বিষয় হওয়ায় তাঁর ‘শিক্ষা পরিভাষা’ গ্রন্থটি আমাকে ভীষণভাবে উপকৃত করছে। সদ্য প্রকাশিত (ফেব্রুয়ারি, ২০১৭) ‘শিক্ষা পরিভাষা’ গ্রন্থটি প্রসঙ্গে শোয়াইব জিবরান জানিয়েছিলেন, ‘এটি একটি শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিদেশি শব্দের সমুচিত বাংলা প্রতিশব্দ কোষ-গ্রন্থ। শিক্ষা নিয়ে যারা কাজ করবেন, তাদের জন্য এটি একটি প্রয়োজনীয় বই। শিক্ষাবিজ্ঞান ও শিক্ষাতত্ত্ব নিয়ে আমি প্রায় দেড় যুগ ধরে কাজ করছি। আর তাই, শিক্ষা নিয়ে আমার বেশ কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে। আমি চেষ্টা করেছি, সে আলোকে এ কাজটি করার। এটা শিক্ষার কোনো তাত্ত্বিক মূল্যায়ন নয়, শুধু এমন কিছু বিদেশি শব্দের সঠিক বাংলা প্রতিশব্দ, যা আমরা প্রায়ই ভুল করে থাকি। এই বইটিতে তিন হাজার বিদেশি শব্দের সঠিক ও শুদ্ধ বাংলা প্রতিশব্দ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাবিষয়ক একটি প্রয়োজনীয় বই হতে পারে এটি।’

৯.
‘লেখকদের লেখক’ কমলকুমার মজুমদার চর্চায় তিনি একজন একনিষ্ঠ অগ্রগন্য সাধক। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত তার পিএইচডি থিসিসের সংক্ষিপ্তসার ‘কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাসের করণকৌশল’ আমার কাছে একটি অনসরণযোগ্য গবেষণাগ্রন্থ। কমলকুমার মজুমদারকে কেন্দ্র করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নানাদিকের ছবি স্পষ্ট হয় তার উপস্থাপনার মুন্সিয়ানায়। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বের হয় শোয়াইব জিবরানের সম্পাদনায় ‘কমলকুমার চরিতম্’। বইটিকে বলা যায় ব্যক্তি কমলকুমার মজুমদার সম্পর্কে তার অনেক নিকটজন ও বিখ্যাত লেখকদের লেখার সংকলন। বইটির প্রকাশ প্রসঙ্গে শোয়াইব জিবরান লেখেন ‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কমলকুমারের রচনায় মগ্ন হয়েছিলাম। তারপর তাঁকে নিয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে একটি ছোট্ট থিসিস পেপার লিখতে গিয়ে ব্যক্তি কমলকুমার সম্পর্কে অদ্ভুত সব তথ্যের মুখোমুখি হতে থাকি। পরবর্তীকালে পিএইচডি গবেষণা উপলক্ষে কলকাতায় আরও বিস্ময়কর সব গল্পের মুখোমুখি হই। এতে কমলমানস বোঝা আমার জন্য বেশ দুরূহ হয়ে উঠতে থাকে। কিন্তু এক সময় আবিষ্কার করি অধিকাংশ কাহিনী উপকাহিনীর উৎস হচ্ছে কমল সহচরদের একগুচ্ছ মৌলিক রচনা। এই রচনাগুলোর তথ্যই তাবেঈনদের মুখে বিভিন্ন রূপ এমনকী বিকৃত রূপ ধারণ করেছে। আমি তখন মূল রচনা নিয়ে একটি সংকলনগ্রন্থ প্রণয়নের প্রয়োজন অনুভব করি।’ ‘কমলকুমার চরিতম্’-এ স্থান পেয়েছে শোয়াইব জিবরানের দীর্ঘ এক ভূমিকাসহ কমলকুমার মজুমদার সম্পর্কে সত্যজিৎ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, স্ত্রী দয়াময়ী মজুমদার, অশোক মিত্র, লোকনাথ ভট্টাচার্য, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, বেলাল চৌধুরী, উদয়ন ঘোষ ও সুব্রত রুদ্রের লেখা। এছাড়া রয়েছে কমলকুমার মজুমদারের বেশ কিছু দুর্লভ আলোকচিত্র। লেখাগুলোর মধ্যে ব্যক্তি কমলকুমার মজুমদারকে যেমন জানা সম্ভব হয়, তেমনি সাহিত্য, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা বা নাটক সম্পর্কে তার নিজস্ব ধ্যানধারণাও অনেকখানি টের পাওয়া যায়।

১০.
তাঁর কবিতা বিষয়ক ভাব-ভাবনার বুদবুদ শব্দ-সুর শোনা যাক এক সাক্ষাৎকার থেকে।-
‘দুপুর মিত্র: আপনি কেন কবিতা লিখেন?
শোয়াইব জিবরান: একখণ্ড গু- কে বা একটি গোলাপকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তুমি কেন গন্ধ ছড়াও? তাহলে কী উত্তর পাওয়া যাবে! আসলে গন্ধ বা সুগন্ধ ছড়ানো তাদের উভয়েরই সত্তার অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ্। এটি না করে তারা পারবে না। লেখা তেমনি আমার সত্তার অংশ। না লিখে পারবো না। আর আমি দুটি ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত। এর একটি হচ্ছে এ্যাজমা আর অন্যটি হচ্ছে লেখারোগ। এ্যাজমা দম বন্ধ করা ভয়াবহ অসুখ। তবে এটি সাধারণত যখন-তখন হয় না। সাধারণত শীতকালে আক্রান্ত হই। তাই একটা প্রস্তুতি থাকে। তবে লেখা রোগটি যখন-তখন দেখা দেয়। প্রস্ততি সব সময় থাকে না। মাঝে মাঝে এ সমযে বিব্রতকর অবস্থায়। ফেলে। চুমু খাচ্ছি তো কবিতার চরণ মনে এলো। কী ভয়াবহ। এ রোগের সাথে সিফিলিস রোগের মিল আছে। মাঝে মাঝে মনে হয় সেরে গেছে। লেখারোগ নেই। ভাল আছি। কিন্তু কয়েকদিন পর আবার দেখা দেয়। বড় যন্ত্রণার মধ্যে আছি রে ভাই।

দুপুর মিত্র: কবিতা লেখার জন্য একজন কবির কি ধরণের প্রস্তুতি দরকার?
শোয়াইব জিবরান: প্রথমত সহজেই আক্রান্ত হতে পারে এমন একটি সংবেদনশীল মন। আর পাঠ। পাঠের কোন বিকল্প নেই। বিচিত্র বিষয়ে পড়াশুনা। চটি থেকে মহাভারত। কবিতা থেকে কসমোলজি।যার পড়ার বিষয় যত বিচিত্র হবে তার লেখা ততো ভাল মানের হবে। আর তার সময় পর্য়ন্ত লেখালেখি কতদূর গেছে সে বিষয়ে ধারণা থাকা দরকার। শব্দের ওজন, ভাষার গাঁথুনি সম্পর্কে স্থপতির ধারণা থাকতে হবে। ছন্দজ্ঞান থাকা দরকার। ওটা শব্দ সংস্থানবিদ্যারই অঙ্গ।’

১১.
কবি শোয়াইব জিবরানের কবিতা ছাড়াও তাঁর গদ্যও আমাকে টানে। ‘শোয়াইব আহমেদ থেকে শোয়াইব জিবরান: ছাই থেকে জেগে উঠি গণকবি দিলওয়ার তোমার নামে’ নিজের নাম বদলের আত্মকাহিনিটিই পাঠ করা যাক তাঁর নিজের ভাষায়, ‘তখন সবেমাত্র ভর্তি হয়েছি সিলেট এম.সি কলেজে, ইন্টারে। থাকি বিখ্যাত বালুচর হোস্টেলের ফিফথ ব্লকের ৫০২ নম্বর কক্ষে, যেটিতে গত বৎসর আগুন দেয়া হয়েছিল। হোস্টেলে মন টিকে না। মা বাবারে ফেলে গেছি। তাই সুযোগ পেলেই শহরে ছুটি। যাই মূলত সিলেট বার্তা অফিস, বেদানন্দ বাবুর হোটেল, ড.সফিউদ্দিন আহমদ স্যারের বাসা আর কবি দিলওয়ারের- খান মঞ্জিলে। এক সময় খান মঞ্জিলই হয়ে উঠল একমাত্র আড্ডাস্থল। প্রায় দিন সকালে যাই রাতে ফিরি। অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে রাখতেন কবি দিলওয়ার। মনে হতো সক্রেটিসের সামনে বসে আছি এথেন্সের অলিভ বৃক্ষ তলায়। দুপুরের খাবার তো বান্ধা ছিল। বিচিত্র বিষয় নিয়ে কথা হতো। কাব্যতত্ত্ব থেকে ধর্মতত্ত্ব। আর লাল বিপ্লব।
আমি তখন শোয়াইব আহমেদ শোয়েব নামে লেখালেখি করি। ঊর্মি নামে একটা সাহিত্যপত্রিকাও মৌলবীবাজার সেন্ট্রাল রোড থেকে বের করি। দিলওয়ার নিয়মিত লেখা দেন।

একদিন তিনি হঠাৎ বললেন, আইচ্ছা তুমি কি তোমার নামের মানে জানো? বললাম, নবীর নামে আমার নাম এইটুকু জানি। তিনি বললেন, শোয়াইব মানে হইল আগুনের স্ফুলিংগ। আর আহমেদ শব্দটি এসেছে মুহম্মদ থেকে।যার অর্থ প্রশংসনীয়। তাহলে তোমার নামের মানে দাঁড়ালো প্রশংসনীয় আগুনের স্ফুলিংগ। যে আগুন প্রশংসনীয় সে টা তো আগুনের জাত না। কিন্তু আমি তো তোমারে মাঝে জাত আগুনের রূপ দেখি। তুমি কবি। মানে স্বয়ং ঈশ্বরের বার্তাবাহক।আজ থেকে তোমার নাম শোয়াইব জিবরান। মানে আগুনের বার্তাবাহক। প্রকৃত আগুনের। তখন আমি লাল বিপ্লবের স্বপ্ন দেখি। দিলু ভাইয়ের দেয়া নাম খুব মনে ধরলো। এর পর থেকেই লিখতে শুরু করলাম শোয়াইব জিরবান নামে।

তারপর একদিন সিলেট পর্ব শেষ করে চলে এলাম ঢাকায়।ঢাকা থেকে আরো দূর দেশের শহরে। দিলওয়ারের সাথে যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে এলো। কিন্তু তাঁর দেয়া নামটি রয়ে গেল। তবে সিলেট গেলেই তাঁর সাথে একবার দেখা করতামই। তিনিও খুব খুশি হতেন। উজ্জল হয়ে উঠতেন।তারপর মোবাইলের যুগ এলে তিনি শুরু করলেন মেসেজ দেয়া। দীর্ঘ দীর্ঘ মেসেজ পাঠাতেন কবি। রোমান হরফে। সব সময় পুরোটা পড়ে শেষ করতে পারতাম না। সর্বশেষ মৃত্যুর কয়েকদিন আগে ১৫ সেপ্টেম্বর রাত ১১টায় ৩৮ মিনিটে আমাকে লিখলেন, Which weapon is most infernal than chemical weapon?

আজ মাঝে মাঝে ভাবি নিজের পিতৃদত্ত নামে ফিরে যাই। বন্ধুদের বলেছি। তাঁরা বলেছে সে কি আর সম্ভব! তুমি তো ঔ নামেই পরিচিতি পেয়ে গিয়েছো। এখন নতুন সাধারণ নামে পাঠক তোমাকে আর নেবে না। লাল বিপ্লবের স্বপ্ন এখন আমার কাছে ম্লান হয়ে এসেছে। সেদিন ফেসবুকে ছবি আপলোড করেছি। দেখি ছবির নীচে লন্ডন থেকে কবি টি এম আহমদ কায়সার লিখে রেখেছেন- আগুন কিশোর! আরও একদিন একটি গদ্য দেখাতে নিয়ে গেছি আমার প্রিয় শিক্ষক সৈয়দ আকরম হোসেনের কাছে। স্যার মনোযোগ দিয়ে পড়লেন। তারপর বললেন, ভাল। তবে তোমার মধ্যে সে স্পার্ক আমি দেখতাম তা এ লেখায় নেই।
হা আগুন, হা স্পার্ক! ছাইয়েরও অধিক শীতল আজ আমার প্রাণ। তবু মাঝে মাঝে ছাই থেকে জেগে ওঠার লেলিহান সাধ জাগে কবি দিলওয়ার তোমার নামে। ’ (২০ শে অক্টোবর, ২০১৩)

১২.১
এবার কবি শোয়াইব জিবরান-এর কবিতার স্বাদ নেওয়া যেতে পারে, পাঠ করা যাক।–
মাথায় পালক নিয়ে এই অসময়ে বেরুনো কি ঠিক হবে?
চারিদিকে আগুন নদী, পথঘাট অগ্নিবাতাস।
যারা গিয়েছিল অন্ধ পাখি হাতে কোড়া শিকারে
ফেরে নি। রক্তের ঘ্রাণ বাতাসে
চাপ চাপ ছড়িয়ে আছে।
পিতা প্রপিতামহ খেয়েছে বনের বাঘ
আমি সামান্য ভগ্নস্বাস্থ্য বালক, দু’হাতে কী আর আগলাব
রক্তমাখা দাঁত, নখর, বাঘডাক।
নাকেমুখে বনের কাঁটা, পাতা লেগে আছে
কাঠুরিয়া শক্ত কুড়ালে কেটেছে বৃক্ষকোমর
অরণ্য হাত পা ছড়িয়ে বনের গায়ে পড়েছে
আমার শুধুই অরণ্যবাস, না কাঠুরিয়া, না শিকারি।
নারী এবং হরিণমাংস খেয়েছে যারা, জিহ্বা পাতালব্যাপী
নারীর গর্ভে জন্ম মাগো, পিতা ছিলেন হরিণ শিকারি
ব্যাধের সংসারে জন্ম বধূ বংশসুতোবনে
আমার হাতেই দিয়েছে তুলে তিরধনু পাখির পালক
এই অসময়ে করাল বনে কার কাছে আত্মা রাখি?
(শিকারি)

১২.২
চাকার উপর ক্লান্ত শুয়ে ছিল পথ
চাকা ঘোরাতে ঘোরাতে পথ ফিরছিল বাড়ি।
পথের উপর ছিলাম সামান্য পথিক
ছুটে আসা অশ্বখুর, ধুলো, শত্রুর হল্লা
শব্দ গুনতে গুনতে বিপন্ন অস্থির।
যারা ছিল ঘরে ঘরে পিতা পুত্র মাতা
তারা তুলেছে হাহাকার, ছুটেছে চৌদিকে
রাজা ছিলেন সুরাঘুমে তিনি গেছেন বনে
আর আমি সামান্য শব্দশিকারি
শত্রুর ধুলো গুণে সন্তান করেছি প্রসব
তারা আজ ধুলোর উত্তরাধিকারী।
(ধুলোর গাথা)

১২.৩
মধ্যরাতে চুপিচুপি তার চুলে সুর তুলে দেখি
উড়ে এসেছে হাজার পাখি
খাঁচায় ধরা দেওয়া পাখি আর ঘাসেদের সেই ঘনরাত।
এমনি তাকে লোহার সিন্দুকে ভরে দিয়েছিলেন অবিশ্বাসী পিতা
দুটো শস্যদানা নারকেলের খোলে
দেহের উত্তাপে ক্ষুণ্ন মিটিয়েছি।
শিয়রে মোমবাতি জ্বলে
আমরা জ্বলি দেহের আগুনে
আগুন আগুন খেলা অর্ধরাত।
তারপর মধ্যরাতে দিঘির মতো সে চুপচাপ।
আমি সংগোপনে যেন পাখি প্রিয়
বাঁশিপ্রিয় মাঠের রাখাল
হাওয়া এনেছে বয়ে কী যে হাহাকার
মায়ের স্মৃতি মনে রেখে
তার চুলে যেই চক্ষু করেছি গোপন
অমনি খুব মৃদু পায়ে সুর এল
চুলের ভেতর কণ্ঠে তুলে নিলো গান
উড়ে এল হাজার পাখি, আহা উড়ে যাওয়া পাখি।
(পাখিরাত)

লেখক:
আবদুল্লাহ আল মোহন, সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ভাসানটেক সরকারী কলেজ, ঢাকা

Comments

comments

এমন আরো খবর:

Web developed by: AsadZone.Com

Send this to a friend