চৈত্র সংক্রান্তি

0
0
সর্বমোট
0
শেয়ার

ফাহাদ মশিউর রহমান

‘জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক,
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’

নানামুখী অস্থিরতার মধ্যেও কালের নিয়মে চিরবিদায় নিচ্ছে ১৪২৫ বঙ্গাব্দ। বাংলা বর্ষের সমাপনী দিনটি ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ নামেও সমধিক পরিচিত। শনিবার ৩০ চৈত্র ১৪২৫। বাংলা সনের শেষদিন। শেষদিন ঋতুরাজ বসন্তেরও। আজ চৈত্র সংক্রান্তি। বাংলা বছরের শেষ দিন হওয়ায় চৈত্র মাসের শেষ এ দিনটিকে চৈত্র সংক্রান্তি বলা হয়।

বাংলা বছরের হিসাব চলে সূর্যের সঙ্গে সঙ্গে। সৌরবছর আমাদের। এখানে সময়ের শেষ বা শুরু বলে কিছু নেই। বারো মাসের বছরের শেষ মাস চৈত্রে’ও বছরের ‘শেষ’ হয় না। চৈত্রে ‘সংক্রান্তি’ হয় আগামী বছরের সাথে।

ক্রান্তি মানে কিনারা। সংক্রান্তি মানে এক ক্রান্তি বা এক কিনারা থেকে আরেক কিনারায় যাওয়া। অর্থাৎ ক্রান্তির সঞ্চার বা সাঁতার। মহাকালের অনাদি ও অশেষের মাঝে ঋতুর বদল করতে করতে সূর্যের ও আরো অনেক গ্রহ-উপগ্রহ-গ্রহাণু-উল্কার সাথে সাথে সাঁতরে চলা। এ এক চক্রের মতো, চরকার মতো, সূর্য সাঁতরে চলে, ঋতুরা ফিরে ফিরে আসে। ঘুরে ঘুরে ফিরে আসে সময়। নতুন নাই, পুরাতনও নাই।

উপমহাদেশের সনাতন প্রথা অনুসারী মানুষেরা এই দিনটিকে খুবই পুণ্যের দিন বলে মনে করেন। সনাতন পঞ্জিকা মতে দিনটিকে গণ্য করা হয় মহাবিষুব সংক্রান্তি। এছাড়া বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকেরে এই দিনটিকে নানা উৎসবের মাধ্যমে পালন করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিজু ও বৈসাবি উৎসব।

সাধারণত চৈত্রসংক্রান্তির আলোচনাতে মেলা, গাজন, পূজার কথা বলা হয়। কিন্তু এর বাইরে আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত আছে চৈত্র সংক্রান্তি। যা শুধু উৎসব নয়, এক ধরণের কথা চলাচলি। নিজের ও প্রকৃতির খোঁজ নেওয়া। এই খোঁজ নেওয়ার দায়িত্ব পড়ে নারীর ওপর। যেটা কৃষিজীবি মানুষের প্রজ্ঞার দারুণ প্রকাশ।

বাংলাপিডিয়া সূত্র জানায়, অতীতে চৈত্র সংক্রান্তি মেলা উপলক্ষে গ্রামাঞ্চলের গৃহস্থরা নাতি-নাতনিসহ মেয়েজামাইকে সমাদর করে বাড়ি নিয়ে আসত। গৃহস্থরা সবাইকে নতুন জামাকাপড় দিত এবং ভালো খাওয়া দাওয়ারও আয়োজন করত। মেলার কয়েকদিন এভাবে তারা সবাই মিলে আনন্দ উপভোগ করত। বর্তমানে শহুরে সভ্যতার ছোঁয়া লাগায় আবহমান গ্রামবাংলার সেই আনন্দমুখর পরিবেশ আর আগের মতো নেই। তবে এখন শহরাঞ্চলের নগর সংস্কৃতির আমেজে চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব বা মেলা বসে, যা এক সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

সনাতন মতে বাংলা মাসের শেষ দিনে শাস্ত্র ও লোকাচার অনুসারে স্নান, দান, ব্রত, উপবাস প্রভৃতি ক্রিয়াকর্মকে পুণ্যের কাজ বলা মনে করা হয়।

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে উদ্বিগ্ন কৃষকরা নিজেদের বাঁচার তাগিদে বর্ষার আগমন দ্রুত হোক, এই প্রণতি জানাতেই পুরো চৈত্র মাসজুড়ে উৎসবের মধ্যে সূর্যের কৃপা প্রার্থনা করে। এখন সূর্য তার রুদ্ররূপে প্রতিভাত। তাই চৈত্র সংক্রান্তিতে নানা উপাচারের নৈবেদ্য দিয়ে তাকে তুষ্ট করে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

চৈত্র সংক্রান্তিতে দেশজুড়ে চলছে নানা ধরনের মেলা, উৎসব। হালখাতার জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সাজানো, লাঠিখেলা, গান, আবৃত্তি, সঙযাত্রা, রায়বেশে নৃত্য, শোভাযাত্রাসহ নানা অনুষ্ঠান আর ভূত তাড়ানোর মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে চৈত্র সংক্রান্তি।

নতুন বছরকে বরণের প্রস্তুতির পাশাপাশি শেষ দিনটিতে থাকে বর্ষবিদায়ের নানা আয়োজন। চৈত্র সংক্রান্তিতে পুরান ঢাকায় ওঝা সেজে হাতে ঝাড়ূ নিয়ে বিশেষ ভঙ্গিমায় ছোট শিশুরা ভূত তাড়ানোর খেলায় মেতে ওঠে।

দেশের হিন্দুপ্রধান অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে চৈত্র সংক্রান্তির নানা উৎসবের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে বারোয়ারি মেলা অন্যতম। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, দিনাজপুরের ফুলছড়িঘাট এলাকা, কুমিল্লার লাঙ্গলকোট ও ঢাকার সাভার, ধামরাইয়ে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা বসে।

চৈত্র সংক্রান্তির দিন সন্ন্যাসীরা কিংবা সাধারণ লোকের কারও কারও শূলফোঁড়া, বাণফোঁড়া ও বড়শিগাঁথা অবস্থায় চড়কগাছে ঘোরাসহ প্রভৃতি ‘ভয়ঙ্কর’ ও দৈহিক কলাকৌশল দেখা যায়।

0
0
সর্বমোট
0
শেয়ার

Comments

comments