নিবন্ধন : ডিএ নং- ৬৩২৯ || বৃহস্পতিবার , ১৮ই জুলাই, ২০১৯ ইং , ৩রা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৪ই জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

বঙ্গাব্দ তুমি কার?

বঙ্গাব্দ তুমি কার?

জ্যোতি পোদ্দার

যে কোন ভাবাদর্শের নিজস্ব চিন্তার কর্মতৎপরতা নিয়ে তার নিজস্ব পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার থাকে। হোক সে জাতিবাদি রাষ্ট্রের বা রাষ্ট্রের অন্তর্গত যেকোন ভাবাদর্শের। হিসাব নিকাশের জন্য পঞ্জিকা ছাড়া কোন পথ নেই।বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় খ্রিষ্টীয় পঞ্জিকা দ্বারা আমি আমরা শাসিত। সে আপনি চান বা না চান তাতে কিছুই যায় আসেন।

যে কোন সাল বা সনের শুরুতে কোন না কোন মহান ব্যক্তির জন্ম বা চিন্তার সাংবাৎসিক কাঠামো দেখি।কোন কোন সাল আর্য দ্বারা শাসিত যেমন বিক্রমাব্দ, লক্ষনাব্দ শকাব্দ, কোনটা বিদেশী প্রভাবে যেমন হিজরি, খ্রিষ্টীয় আবার কোনটা ব্যক্তি জন্ম ও তার কর্ম দ্বারা শাসিত যেমন চৈতন্যব্দ,অশোকাব্দ আবার কোনটা শংকর– দেশিয় ও তৎকালিন কেন্দ্রের শাসকের দ্বারা শাসন কাঠমো পরিগঠিত করার জন্য যেমন ইলাহি অব্দ, বঙ্গাব্দ।

যে কোন সাল পরিগঠিত হোক না কেন তার শরীর ও আত্মায় কুটস্থ থাকে জন মানুষের বিশ্বাস সংস্কৃতি ধর্মাশ্রিত ভাব ভাবনার বয়ান থাকে জন গোষ্টি পরিচালিত করবার ও খাজনা তথা আর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করবার হদিশ। নিছক কোন পঞ্জিকা হয় না। হতে পারে না।

আর যে কোন পঞ্জিকার দিন তারিখ বার তিথি কাল বেলা মাহেন্দ্রক্ষণ গনিত হয় নিদির্ষ্ট হিসাবকে আশ্রয় করে। সাধারণত তিনভাবেই হিসাব গণিত হয়। এক সৌরমান দুই চান্দ্রমান তিন নক্ষত্রমানকে আশ্রয় করে। একটু আচালেই বোঝায় যায় কে কোন মানকে ধরে হিসাব তথা পঞ্জিকা পরিগঠন করছে তা নির্ভর করছে ঐ ব্যক্তি বা জনগোষ্টির স্থান কাল এবং তার ইতিহাসের অবস্থান দ্বারা। যেমন হিজরি সন। বা পারস্যের বা মিশরের ক্ষনগননা পদ্ধতি।

বাংলা সন একটি শংকর সন। এর আর্বিভাবের নিদির্ষ্ট কার্যকারন আছে।তার রাজনৈতিক বোঝাপড়া আছে আছে বাংলা অঞ্চল রাজনৈতিক ভাবে পরিগঠিত হবার আগাম পূর্বাভাস।

আজকাল প্রায়ই শুনি বঙ্গাব্দ হিন্দুদের। নববর্ষ হিন্দুদের।বাংলা সসন হিন্দুদের। সত্যি কী তাই? অথচ হিন্দু শব্দটি এই সেদিনের। একটি জনগোষ্ট “স” “হ” উচ্চারনের কিভাবে সিন্ধু থেকে হিন্দুতে রূপান্তরিত হলো তার ইতিহাস অজানা নয়। নয় হাল আমালের হিন্দুত্ববাদি রাজনীতি। কিংবা তার আগে হিন্দু জাতিয়তাবাদির মাঠ তৈয়ারের কাহিনী।

যাক সে কথা। সব সাল বা সন ব্যক্তি কেন্দ্রিক একমাত্র বঙ্গাব্দ তামাম ভুমিকে আশ্রয় করে পরিগঠিত।

বাংলা অঞ্চলকে কে না শাসন করেছে? বঙ্গ অপাঙক্তেয়। পান্ডব বর্জিত এলাকা। নমশুদ্রের ঘিঞ্জি বসত ভিটা।বর্ণবাদি ব্রাহ্মনদের নাক ছিটকানো অঞ্চল। তদ্রুপ ভাষা। বঙ্গজননির বয়ান অচ্ছুত। রাজদরবারে তার ঠাঁই নেই। নগরের বাইরে তার বসত। ডোম চাষা কৈবর্তের ভাষা।

সেই ভাষা ও তার তামাম বঙ্গ নামে বঙ্গাব্দ হওয়ার নিশ্চয় তাৎপর্য আছে।ভাষা কেন্দ্রিক রাষ্ট্রকাঠামো নির্মানে নিশ্চয় বঙ্গাব্দ গঠনের ভুমিকা ও তাৎপর্য আছে। নিছকই তো কোন কিছু হয় না। হতে পারে না। সূত্রায়ন কোথাও না কোথাওহয়ই।

এই পাক ভারত উপমহাদেশ ইসলামের আর্বিভাব একটি ঐতিহাসিক ভুমিকা রয়েছে। ইসলামের সাম্য ধারণা বর্ণবাদাশ্রতি সমাজকে গতিশীলতা দান করেছে। এ অঞ্চলের অন্যন্য মুসলিম শাসকের মতো মোগলদের ভুমিকা কোন অংশেই কম নয়।যে সাম্রাজ্যের সুচনা বিন্দু বাবর সেই শাসনামলের শাসক সম্রাট আকবর গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করেছেন বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করে। তার নির্দেশে তার রাজসভার বিজ্ঞানি হিজরি সনের সাথে মিলিয়ে তৎকালিন সনের সংযুক্ত করেই বঙ্গাব্দের সূচনা করেন।বঙ্গাব্দ হিজরি সনের বিবর্তিত রূপই বঙ্গাব্দ। দুটো ভাবার্দশের সন্মেলিত রূপ বঙ্গাব্দ।

বঙ্গাব্দকে অস্বীকার করা মানেই আকবরের ঐতিহাসিক ভুমিকাকে অস্বীকার করা। হিজরিই সন প্রবর্তনের সামাজিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে হওয়া।যে বঙ্গ ও বঙ্গভাষা পরবর্তিতে বাংলাভাষা আন্দোলন ও রাষ্ট্রগঠনের পরিক্রমকে হৃদয়দিয়ে বোঝার ব্যর্থতা।

সমকালিন বাংলাদেশে বিগত বছরগুলোতে জনমানুষের মনোভুমিতে বঙ্গাব্দ নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ ও অস্বীকার ও বঙ্গাব্দের অজর্নকে সকল বাংলা ভাষাভাষি মানুষের নয় তা একটি জনগোষ্টির দিকে ঠেলে দেয়া মুলত তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য বোঝার ব্যর্থতা।

অন্যদিকে আসুন দেখে আসি হিন্দু নামাঙ্কিত সনাতনীদের কাজ কারবার। হিন্দু পরিবারের ধর্ম কর্ম স্মার্ত পন্ডিত প্রবর লোকানাথ পঞ্জিকা দ্বারা শাসিত।জন্ম তিথি থেকে শুরু করে বিয়ের লগ্ন অন্নপ্রাশন শ্রাদ্ধশান্তি সীমান্তোন্নয়ন সব কিছু পঞ্জিকা দ্বারা শাসিত। বর্তমানে প্রচলিত লোকনাথ পঞ্জিকায় তারিখ বার তিথির বিভন্নতা রয়েছে। পঞ্জিকাপ্রণয়ন কমিটি প্রথমে নিজস্ব তারিখ দিয়ে পরে লিখেছে বাংলাদেশ মতে। হিন্দুরা তাদের নিয়ম পালনের ক্ষেত্রে প্রথমটি পালনে সচেষ্ট।

: কাজে কাজেই ১লা বৈশাখ থেকে শুরু করে সব কিছুতেই তারিখের বিভন্নতা বিদ্যমান। প্রথম তারিখটা মনে করে তাদের নিজস্ব দ্বিতীয়তা বাংলাদেশের। একটি স্বাধীনদেশের যে নিজস্ব তারিখপত্রিকা থাকতে হয় এবং সেই অনুযায়ি কর্তক্যকর্ম নির্দ্ধারন যে নাগরিকের পবিত্র কর্তব্য তা তারা ভুলে গেছে। রাষ্ট্রিক রাজনীতিবিবর্জিত ধর্মীয় যাপন করছে। পশ্চিম বাংলার বাংলাভাষা একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের প্রাদেশিক ভাষা। আর বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সত্তা। তার পঞ্জিকা আলাদা হতে বাধ্য।ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য বহুরৈখিক। সেটি পালন ও কার্যের অভিমুখ খুলে দিতে জাতিয়াবাদি নেতারাও ব্যর্থ হয়েছেন।

বঙ্গাব্দ নিয়ে নিয়ে ফেকরা এক নয় বহুকিসিমের।সমস্যাটা হচ্ছে ইতিহাস যে শুধু মাত্র মৃত মানুষের জন্ম তারিখ নয় সে যে একটি সপ্রান সত্তা তার শিক্ষা আমরা পাইনি। ইতিহাস কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। তার প্রয়োজনীয় উপাদান নিজেই সংরক্ষন করে। নিজেই মানুষের ভেতর দিয়ে কাজ করে ঠিকই শিক্ষা দেন।

সুতরাং বঙ্গাব্দ তুমি এই বাংলাদেশের। তুমি বাংলা ভাষাভাষী সকল মানুষের।

লেখক: শিক্ষক ও কবি

Comments

comments

এমন আরো খবর:

Web developed by: AsadZone.Com
x

Send this to a friend