নিবন্ধন : ডিএ নং- ৬৩২৯ || বৃহস্পতিবার , ২১শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২৩শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

পন্ডিত রামকানাই দাশ

পন্ডিত রামকানাই দাশ

আবদুল্লাহ আল মোহন

১.
বাংলাদেশের প্রখ্যাত লোকসঙ্গীতশিল্পী, সংগ্রাহক, সংগীতজ্ঞ পণ্ডিত রামকানাই দাশ। একুশে পদকপ্রাপ্ত লোকসংগীত শিল্পী ও মাটির গানের গবেষক পন্ডিত রামকানাই দাশের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৫ এপ্রিল সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার পুটকা গ্রামে। বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি মহান এই সুরসুধাকরকে, সুরসাধককে। উল্লেখ্য যে, পণ্ডিত রামকানাই দাশ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে ২০১৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাত সোয়া ১১টায়। মহাপ্রয়াণের আগ পর্যন্ত তাঁর সুরেলা কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ থাকতো দেশ-বিদেশের দর্শক-শ্রোতা। দেশের অনেক খ্যাতনামা শিল্পীও তাঁর কাছে তালিম নিয়েছেন। তিনি তৈরি করে গেছেন অসংখ্য যোগ্য শিষ্য। তাদের মধ্যদিয়েই বেঁচে থাকবেন তিনি কাল-কালান্তর। মনে পড়ছে ঢাকাতে বিভিন্ন সময়ে, নানা আয়োজনে অংশ নেওয়া এই শিল্পীর আনন্দ-মধুর সুরধ্বনি সরাসরি শোনার সুযোগ হয়েছিলো আমার। আবার সিলেটে চাকুরিকালীন সময়ে বার দু’য়েক তাঁর কাছে যাবারও সুযোগ পাই। শিল্পীর সরল, সাধারন কিন্তু বৈভবময় শৈল্পিক জীবন যাপন দেখারও সুযোগ পাই আমার সিনিয়র সহকর্মি মীরাদিদি’র কল্যাণে। তাঁর প্রয়াণের পরে ছায়ানট আয়োজিত ওস্তাদ রামকানাই দাশ স্মরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সুযোগ হয় আমার। সেদিন নানাজনের স্মৃতিচারণের উচ্চারিত আবেগী বাণীও মনে পড়ছে আজ লিখতে গিয়ে।

২.
পন্ডিত রামকানাই দাশের জন্ম সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার পুটকা গ্রামে হলেও তাঁর পৈতৃক বাড়ি সুনামগঞ্জেরই দিরাই উপজেলার পেরুয়া গ্রামে। বাবা রসিকলাল দাশ ও মা দিব্যময়ী দাশ ছিলেন লোকসংগীতের সাধক। নেশা হিসেবে জীবনের সূচনালগ্নে গানকে গলায় ধারণ করলেও এক সময় তা পেশা হিসেবেই গ্রহণ করেন পণ্ডিত রামকানাই দাশ। লোকগান এবং উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি জীবিতকালেই ছিলেন বহুল আলোচিত।প্রকৃতির সুনিবিড় তত্ত্বাবধানে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সুরসঙ্গীতের উজ্জ্বল এক দৃষ্টান্ত হিসেবে। সৃষ্টিশীলতার উৎকর্ষে আলো ছড়িয়েছেন দেশীয় সংস্কৃতির উর্বর ভূমিতে। একটি সঙ্গীত পরিবারে জন্ম নেন, তাঁর বাবা ও মা দু’জনই ছিলেন লোককবি এবং লোকগানের শিল্পী। তাই খুব ছোটবেলা থেকে গান শুনেই বড় হয়েছেন তিনি। তাঁর বয়স যখন তিন বছর তখনই তিনি বহু গান গাইতে পারতেন। পরবর্তীতে দেশে ও বিদেশের অনেক ওস্তাদের কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম নিয়েছিলেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তাঁর শিক্ষাগুরুরা হলেন ওস্তাদ কালীমোহন চক্রবর্তী, রাজবিহারী চক্রবর্তী, উমেশ চন্দ্র রায়, অরুণ ভাদুড়ী ও ছগীর উদ্দিন খান। সিলেটের বাইরে, দেশে-বিদেশেও গুণী শিল্পী হিসেবে সমাদর পেয়েছেন ওস্তাদ রামকানাই দাশ। রাগসঙ্গীতের শিল্পী হলেও লোকগীতির বৈশিষ্ট্য তার কণ্ঠে যেন অন্য আরো একটি মাত্রা যোগ করেছিলো। তাঁর গানের বাণী ও সুরের শিকড়টি আপন মাটিতে প্রোথিত ছিলো বলেই সঙ্গীতের সর্বক্ষেত্রে তাঁর এই স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণ। আর তাই সাবলীলভাবে সঙ্গীত জীবনে রাগরাগিণীর চর্চা, লোকগীতির চর্চা আবার একইসঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সাধনাও করে গেছেন ওস্তাদ রামকানাই দাশ।

৩.
লোকসঙ্গীত সাধক সঙ্গীত গুরু শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও লোকসঙ্গীত শিল্পী পণ্ডিত রামকানাই দাশকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘সুরের পথিক’। ছবিটিতে তাঁর দীর্ঘ সুরময় জীবনের নানা দিক ফুটে উঠেছে। বাংলার লোকসঙ্গীতের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার ও তার ঐশ্বর্য্যের দিকটি এই ছবিতে চিহ্নিত হয়েছে, যার সঠিক লালন করেছেন পণ্ডিত রাম কানাই দাশ। এটিতে মূলত কিছু প্রাচীন লোকগানের অংশবিশেষ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে আছে কবি, ঘাটু, উড়ি, গাজী, ত্রিনাথ, বাউল, টপ্পাসহ লোক আঙ্গিকের বিভিন্ন ধারার গান। এছাড়া সঙ্গীতজ্ঞ প্রয়াত ওয়াহিদুল হক, ড. সন্জীদা খাতুন, ড. করুণাময় গোস্বামী, সঙ্গীতশিল্পী সুবীর নন্দী, চন্দনা মজুমদারসহ দেশের বরেণ্য কয়েক ব্যক্তির বক্তব্য এবং উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কিছু কিছু অংশ এটিতে স্থান পেয়েছে। ছবিটি নির্মাণ করেছেন নিরঞ্জন দে এবং প্রকাশিত হয়েছে লেজার ভিশনের ব্যানারে।

৪.
আজীবন এই সুরের সাধক ১৯৬৭ সাল থেকে সিলেট বেতারে নিয়মিত সংগীত শিল্পী হিসেবে গান পরিবেশন শুরু করেন । একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে গান গেয়ে সবার মনোবল সমুন্নত রাখার কাজও করেছেন রামকানাই দাশ। ১৯৮২ সালে বাংলা একাডেমি মিলনায়তনে শুদ্ধ সংগীত প্রসার গোষ্ঠীর শীতকালীন সংগীত সম্মেলনে উচ্চাঙ্গসংগীত পরিবেশন করে তিনি প্রথম সুধীমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বাংলাদেশ বেতারের সিলেট কেন্দ্রে সরাসরি সংগীত শিক্ষার আসর ‘সা রে গা মা’ দুই বছর পরিচালনা করেন তিনি। পুরাতনী বাংলা গান নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেন পণ্ডিত রামকানাই দাশ। এই গানকে নাগরিক শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় করতে ভূমিকা রাখেন। দেশে ও বিদেশে তাঁর অসংখ্য ছাত্রছাত্রী রয়েছে। তিনি ছিলেন সংগীত পরিষদ সিলেট সংগঠনের অধ্যক্ষ। তিনি গঠন করেন শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতিষ্ঠান ‘গুরু পরম্পরা’। সঙ্গীত নিয়ে একবার তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যদিও শাস্ত্রীয়সঙ্গীতের মানুষ, কিন্তু পিতৃ ও মাতৃ সূত্রে লোকগান আমার অন্তরে গেঁথে আছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে এই গান সংগ্রহ করা আমার একান্ত ইচ্ছা। এবং ইতোপূর্বে এ কাজ শুরুও করেছি। সিলেটের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে আঞ্চলিক গানের শিক্ষা দেয়া আমার খুব ইচ্ছা। এছাড়া প্রাচীন লোকগানের একটি স্বরলিপির বই করতে চাই।’ আর এজন্যই তিনি আমৃত্যু নিজের প্রতিষ্ঠিত ‘বিনে পয়সার পাঠশালা’য় তিনি দরিদ্র, পিছিয়ে পড়া ও ছিন্নমূল শিশুদের গান শেখাতেন। বিভিন্ন বয়সের অনেক নারী ও পুরুষও তাঁর কাছে সংগীত শিখতে আগ্রহী ছিলেন। সেই গুণী মানুষটি বিনা পয়সায় গান শেখানো শুরু করেন দরিদ্র ও ছিন্নমূল শিশুদের। কারণ ওস্তাদ রামকানাই দাশ মনে করতেন, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে দেশে অরাজকতা বেড়েছে। দেশীয় সংস্কৃতির বদৌলতে বিদেশি অপসংস্কৃতি তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করছে। এতে করে দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে না। দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা ছেলেমেয়েদের দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা দানে আগ্রহ থাকলেও টাকার অভাবে তা পারছিলেন না। এ কারণেই তিনি হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল শিশুদের বিনা পয়সার গান শেখানোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। সিলেট নগরের করেরপাড়া এলাকায় নিজ বাসাতেই শুরু হয় তাঁর ‘বিনা পয়সায় সংগীত শিক্ষা’ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা। সংগীত পরিষদের তত্ত্বাবধায়নে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তির যোগ্যতা হচ্ছে—গান শিখতে ইচ্ছুক দরিদ্র ও ছিন্নমূল পরিবারের সন্তান। প্রতি শুক্রবার সকাল সাড়ে নয়টা থেকে ক্লাস শুরু হয়। শিশুদের মর্জির ওপর নির্ভর করে তাদের ছুটি দেওয়া হয়। গানের পর্ব শেষে চলে নৈতিক শিক্ষার পাঠদান পর্ব। এ পর্বে শিশুদের সৎ ও সত্যবাদী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ছুটির আগে রয়েছে বাধ্যতামূলক ফলাহার। ওস্তাদ রামকানাই দাশ ছিলেন দায়িত্ববান মানুষও। সিলেট অঞ্চলের বাউল গুরু কামাল পাশার স্মৃতিকে সংরক্ষিত করার জন্য সুনামগঞ্জে ‘কামাল পাশা স্মৃতি সংসদ’ গঠন করা হয়। আর তিনি ছিলেন তার আজীবন উপদেষ্ঠা মণ্ডলির সদস্য। তিনি তার সিলেটের করেরপাড়াস্থ বাসভবনে বসে ‘কামাল পাশা স্মৃতি সংসদ’ গঠনের ব্যাপারে সবাইকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করতেন। প্রথম জীবনে ভাটি অঞ্চলে কবিগানের প্রচার ও প্রসার এবং পরবর্তীতে শাস্ত্রীয় সংগীতের দীক্ষা দিয়ে পণ্ডিত রামকানাই দাশ এদেশের সঙ্গীত জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন। বাউল গুরু কামাল পাশার গান নিয়ে রামকানাই দাশ অনেক গবেষণা করেছেন। তাই তিনি তার সম্পর্কে বলেন, ‘সেইসব শিল্পীরাই সবচেয়ে বেশি ভাগ্যবান যারা ওস্তাদ কামাল পাশার মতো উচ্চ শিক্ষিত বাউল শিল্পীর গান শুনেছেন। এবং যারা কামালের গান শুনেনি ও চর্চা করেনি তাদের মতো হতভাগা আর সঙ্গীত জগতে নেই।’ তিনি নেত্রকোনার জালাল কবির নামে ‘জালালগীতি’ বইয়ে প্রকাশিত কয়েকটি গানের উল্লেখ করে বলেন, ‘ওই গানগুলি আমি নিজে কামাল সাহেবকে গাইতে দেখেছি’।

৫.
প্রয়াণের আগ পর্যন্ত তাঁর পাঁচটি একক এ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম এ্যালবামের নাম বন্ধের বাঁশি বাজে। এটি প্রকাশ হয় কমিটমেন্ট প্রডাক্টের ব্যানারে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন বের করে ‘সুরধুনীর কিনারায়’ ও ‘অসময়ে ধরলাম পাড়ি’ নামে দুটি এ্যালবাম, লেজার ভিশন থেকে বের হয় ‘পাগলা মাঝি’ এবং সুরের মেলা থেকে বের হয় ‘রাগাঞ্জলী’ নামে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি এ্যালবাম। এছাড়া নবযুগ প্রকাশনী থেকে ২০১১ সালে ‘সঙ্গীত ও আমার জীবন’ নামে বের হয় একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ। ‘সরল সঙ্গীত শিক্ষা’ নামে প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ডের দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। সাধনালব্ধ কীর্তির স্বীকৃতি স্বরূপ পণ্ডিত রামকানাই দাশ দেশে এবং বিদেশে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। পণ্ডিত রামকানাই দাশকে ২০১৩ সালে মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। এর আগে বাংলাদেশ জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ থেকে ২০০০ সালে দেশের শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত গুণী হিসেবে রবীন্দ্র পদক, সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ‘বাংলা একাডেমি সম্মানসূচক ফেলোশিপ ২০১২’ দেওয়া হয় তাঁকে। লোকগানের সেরা শিল্পী হিসেবে ২০১১ সালে ‘সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’ পান। সর্বশেষ ২০১৪ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। ওস্তাদ মোজাম্মেল হোসেন স্মৃতি পদক, উর্বশী পদক ছাড়াও দেশ-বিদেশ থেকে বেশ কিছু সম্মাননাও পেয়েছেন। দেশে ও দেশের বাইরে পঞ্চাশটিরও বেশি জাতীয়ভিত্তিক সঙ্গীত সম্মেলনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মৃত্যুকালে পণ্ডিত রামকানাই দাশ স্ত্রী অনিন্দিতা চৌধুরী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন।

৬.
জীবন আর সংগীতকে একাকার করে দেখা, যাপন করা প্রকৃত শিল্পীর দেখা মেলা ভার এ জগত সংসারে। কিন্তু তাই বলে তারা দুর্লভ নন বলেই মনে ভাসে পণ্ডিত রামকানাই দাশের মুখচ্ছবি। কারণ মানবিক মানুষ হিসেবে সমাজে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের, হতদরিদ্র প্রাকৃতজনের সন্তানদের সংগীত শিক্ষায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন পণ্ডিত রামকানাই দাশ। তিনি যেমন লোকগানের চর্চা করছেন, তেমনই সমানতালে গরিবদের ছেলেমেয়েদের জন্য চালু করেছেন বিনে পয়সায় গানের ক্লাস। এ ধরনের নি:স্বার্থ বিলিয়ে দেওয়া রামকানাই দাশের মতোন মাটির সন্তানকেই মানায়। আপনার প্রতি রইল অসীম শ্রদ্ধা।

লেখক :
আবদুল্লাহ আল মোহন, সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ভাসানটেক সরকারী কলেজ, ঢাকা

Comments

comments

এমন আরো খবর:

Web developed by: AsadZone.Com

Send this to a friend