নিবন্ধন : ডিএ নং- ৬৩২৯ || সোমবার , ১৮ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২০শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

মেয়েটাকে অন্তত হাজার বার করে মরতে হবে না

মেয়েটাকে অন্তত হাজার বার করে মরতে হবে না

আমিনুল ইসলাম

মেয়েটা মারা গিয়েছে।

এই পুরো ঘটনা নিয়ে আমি আজ অবদি একটা বাক্য পর্যন্ত লিখি’নি!

আমি মিথ্যা বলবো না। মেয়েটার মৃত্যু’র পর আমি খুশি হয়েছি। আমি আসলে খুব বেশি’ই খুশি হয়েছি!

বেঁচে থাকলে মেয়েটাকে প্রতিদিন সকাল, বিকেল এবং রাতে একবার করে মরতে হতো!

আমি গত আড়াই বছর ধরে আমার নিজের ব্যক্তিগত জীবনে সেটা বুঝতে পারছি। আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয়- আমি তো প্রতিদিন বেঁচে থেকে দুই-তিন বার করে মারা যাচ্ছি।

তবে এই লেখায় আমি আমার ব্যাপার’টা আলোচনা করবো না। কারণ, সেটা খানিক ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে কিছুটা হলেও মিল রয়েছে। কারণ দিন শেষে আমরা এক’ই সমাজে বাস করি। আমাদের আশপাশের মানুষজন গুলো তো সেই এক’ই।

আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে- কিছুদিন আগে হিরো আলমকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো- কারণ সে তার বউকে পিটিয়েছে। তার বউ’কে তার এখন আর ভালো লাগে না। সে নাকি তার বউকে এমনকি বলেছিল- চলে যেতে বাড়ি ছেড়ে! এরপর আচ্ছা মতো বউকে পিটিয়েছে। বউটা শেষ পর্যন্ত উপায় খুঁজে না পেয়ে- পুলিশের কাছে গিয়েছে। মামলাও করেছে। এরপর হিরো আলমকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

গতকাল কোন পত্রিকায় পড়লাম- হিরো আলম মুক্তি পেতে যাচ্ছে। সেই পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছে- হিরো আলমের বউ তার সঙ্গে সংসার করতে রাজি হয়েছে।

যেই বউকে তার ভালো লাগতো না; যাকে সে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছে, বউ চলে না যাওয়ায়- তাকে আচ্ছা মতো পিটিয়েছে; সেই বউ কেন এখন আবার তার সঙ্গে থাকতে রাজি হয়েছে?

কারণ আমাদের একটা সমাজ আছে না!

সেই সমাজের মানুষজন নিশ্চয় হিরো আলম গ্রেফতার হবার পর বলেছে
-ছিঃ ছিঃ, এটা তুমি কি করলে? স্বামী অল্প একটু মেরেছে, এই জন্য তোমার পুলিশের কাছে যেতে হবে? এইসব তো সহ্য করে যেতে হয়!

কেউ হয়ত বলেছে

-তোমার তো জীবনটাই শেষ! স্বামীকে জেলের ভাত খাওয়াচ্ছ; তোমাকে আবার বিয়ে করবে কে? তুমি তো খারাপ মেয়ে মানুষ! ইত্যাদি ইত্যাদি আরও অনেক কিছু’ই হয়ত শুনতে হয়েছে।

অথচ আপনি নিশ্চিত জেনে রাখুন, আপনি যদি এই বউকে গিয়ে এখন জিজ্ঞেস করেন- কেন থাকতে রাজি হয়েছেন আবার? উত্তরে হয়ত বলবে- ও রাগের মাথায় এমন করে ফেলেছে। সে নিশ্চয় তার ভুল বুঝতে পেরেছে।

এই হচ্ছে আমাদের সমাজ।

নিশ্চিত জেনে রাখুন, এই বউ এরপর হিরো আলমের সঙ্গে সংসার করবে। যাকে কিনা জেল খাটতে হয়েছে এই বউয়ের জন্য! তার ভাগ্যে ভবিষ্যতে কি অপেক্ষা করছে সেটা নিশ্চয় আর বুঝতে বাকী থাকার কথা না।

এই মেয়ে বেঁচে থাকবে তো নিশ্চয়। তবে বাদ বাকী জীবন সে নিয়ম করে সকাল, দুপুর, রাতে মারা যাবে। তাকে প্রতিদিন’ই মৃত্যু’র স্বাদ নিতে হবে!

পূর্ণিমা নামে একটা মেয়ে আছে। এই মেয়েটা’র নাম তো মনে হয় আমরা অনেকে’ই জানি। কারণ এই মেয়েটার ধর্ষণের ঘটনা পুরো বাংলাদেশ’কে নাড়া দিয়েছিল।

কখনো খোঁজ নিয়ে জেনেছেন – এই মেয়েটা কিভাবে বেঁচে আছে?

পড়তে গেলে তার সহপাঠী’রা মনে করে- তাকে তো ধর্ষণ করা যায়’ই, অফিসে গেলে সহকর্মী’রা মনে করে একে তো ধর্ষণ করা যায়’ই কিংবা এমন ভাবে তাকাবে- মনে হচ্ছে এক্ষুনি আবার ধর্ষিতা হবে মেয়েটা।

আর সমাজের মানুষ গুলো’র কথাবার্তা কিংবা আলাপ-আলোচনা? গিয়ে জিজ্ঞেস করুন কোন ধর্ষিতা মেয়েকে কিংবা তাদের পরিবার’কে।

স্রেফ ধর্ষিতা মেয়ে’র কথা বলছি কেন। একাত্তরে পাকিস্তানীদের হাতে ধর্ষিত হওয়া আমাদের সেই বীরঙ্গনাদের তো রাষ্ট্র বোধকরি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পর্যন্ত দিয়েছে।

অথচ এই সেই দিন পড়লাম- এই একবিংশ শতাব্দী’তে এসে সুনামগঞ্জ জেলার কিছু সমাজপতি নাকি ওই জেলার কিছু বীরাঙ্গনা’কে সপ্তাহ দুয়েক আগে- বেশ্যা, মাগী বলে তাদেরকে সমাজচ্যুত করতে চাইছে এবং তাদেরকে নিজ বাস ভবন থেকে সরিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়েছে।

একাত্তরে পাকিস্তান বাহিনী’র হাতে নিপীড়নের শিকার হবার প্রায় ৫০ বছর পরেও তাদের রক্ষা হচ্ছে না। শুনতে হচ্ছে বেশ্যা-মাগী উপাধি! তাহলে এমনিতেই বুঝা যায় গত ৫০ বছরে এই মানুষ গুলো বেঁচে থেকে প্রতিদিন কতো বার মৃত্যু’র স্বাদ পেয়েছে।

এটা’ই আমাদের সমাজ।

যে সমাজের মানুষ গুলো নুসরাত নামের মেয়েটা’র মৃত্যু’র পর কতো হাহুতাশ করে বেড়াল। সবার কতো মতামত- আহা, মেয়েটা মরে গেল; বেঁচে থাকলে সে হতো প্রতিবাদের প্রতীক ইত্যাদি।

আমি সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র। সমাজ এবং সমাজের মানুষজন নিয়ে’ই আমাকে পড়তে হয়, জানতে হয়।

আমি জানি, এই মেয়ে বেঁচে থাকলে- তাকে প্রতিদিন সকাল-বিকাল মৃত্যু’র স্বাদ নিতে হতো। কে জানে কতো গুলো চোখ তাকে প্রতিদিন ধর্ষণ করতে চাইত! কে জানে- তাকে হয়ত আবার ধর্ষিত হতে হতো!

পুড়ে যাওয়া শরীরের ক্ষত হয়ত শুকিয়ে যেত, কিন্তু দিনে রাতে মানসিক মৃত্যু’র স্বাদ তাকে বয়ে বেড়াতে হতো।

মেয়েটার মৃত্যু’র পর সবাই যখন হা-হুতাশ করছে; আমি রবং তখন খুশি হয়েছি। মেয়েটাকে অন্তত হাজার বার করে মরতে হবে না।

নইলে আমাদের সমাজ তাকে প্রতিদিন নিয়ম করে মৃত্যু’র স্বাদ দিত।

এমনকি আমাকেও গত বছর কয়েক ধরে মৃত্যু’র স্বাদ পেতে হচ্ছে নিয়ম করে- সকাল, বিকেল কিংবা রাতে। সে এক ভিন্ন কারণে!

আপনি কি বুকে হাত রেখে বলতে পারবেন- আপনার জীবনে কোন না কোন এক সময়ে হলেও আপনার সমাজ আপনাকে বেঁচে থেকেও মৃত্যুর স্বাদ দেয়নি?

মানুষ সমাজের জন্য নাকি সমাজ মানুষের জন্য?

যেই সমাজ মানুষকে বেঁচে থাকতে মৃত্যু’র স্বাদ দেয়, সেই সমাজের কি আদৌ আমাদের প্রয়োজন আছে!

লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট

Comments

comments

এমন আরো খবর:

Web developed by: AsadZone.Com

Send this to a friend