নিবন্ধন : ডিএ নং- ৬৩২৯ || মঙ্গলবার , ২০শে আগস্ট, ২০১৯ ইং , ৫ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৮ই জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

আমাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে আমি আমার বুক ঢাকিনি কেন

আমাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে আমি আমার বুক ঢাকিনি কেন

এই যে আমি ফেসবুকে এত লেখা লিখছি, এত ছবি দিচ্ছি সেগুলোর ভেতরে একটা বড় অংশ সেসব লেখায় বা ছবিতে সরাসরি একজন নষ্ট নারী, মাগী, দুশ্চরিত্রা, শরীর বিক্রি করে চলি, ইত্যাদিসহ আরো ভয়াবহ শব্দে, বাক্যে আমাকে প্রতিদিন আর প্রতি মুহূর্তে আক্রমণ করে যাচ্ছে।

আমার শরীর, আমার পোষাক, আমার পছন্দ। আমি আমার পছন্দের একটি পোষাক পরে ছবি দিলাম ব্যাস সেখানে আমাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে আমি আমার বুক ঢাকিনি কেন, আমার পা ঢাকিনি কেন, মাথা ঢাকিনি কেন। আমার বুকের অনেক অংশ উন্মুক্ত হয়ে রয়েছে, ব্যস আমাকে আমার শরীর ঠিক এই অংশ নিয়ে ভয়াবহ রকমের নোংরা গালাগালের ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

আমরা যারা নারী স্বাধীনতার কথা বলছি, নারী মুক্তির কথা বলছি কিংবা নারীদের অধিকারের বিভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে বলছি তাঁরা হয়ত সরাসরি আক্রমণগুলোর শিকার হচ্ছি বলে খুব দ্রুত বুঝতে পারি এই সমাজ ঠিক কি করে “কিছু” পুরুষ সাম্রাজ্যবাদীদের উপর ভ’র করে চলছে এবং কি করে এই অংশটি ডোমিনেট করছে। আমার ভাবনা ও কষ্টের স্থানে অসংখ্য পুরুষ একই ব্যাথা অনুভব করতে পারেন এবং সমব্যাথী হয়ে আমার পাশে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু এই সংখ্যা এত বেশী নগণ্য যে এটি’র উপর ভ’র করে এই নষ্ট সমাজ যে একটা সম অধিকারভুক্ত হয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবে, সে আশা করা আসলে এই মুহুর্তে বৃথাই মনে হয়।

আমাকে “মাগী” বলে দিলেই যেন হয়ে গেলো পুরুষের। আমি রাত্রিযাপন করে অর্থ আয় করি, এইটুকু বলে দিলেই হয়ে গেলো পুরুষের। কেননা নারীর সতীত্বের যে সত্যায়িত সিল ছপ্পর, এটা একেবারেই পুরুষ তার নিজের মত করে নিয়ে নিয়েছে। ফলে মাগী বললেই হয়ে গেলো কিংবা বেশ্যা বললেই হয়ে গেলো। নারীর চরিত্র নিয়ে এই সমাজে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেয়া মানেই হচ্ছে ঐ নারীর জীবন-যাপনকে আপনি বিষাদে মুড়িয়ে দিতে পারলেন, যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট করতে পারলেন।

বাংলাদেশের নারীদের জীবন কেমন সেটি নিয়ে আলোচনা কিংবা ভাবনা আসলেই আমি এক ধরনের বিষাদে আবিষ্ট হয়ে উঠতে থাকি। মনে হয় একটা মধ্যযুগ আমাকে ঘিরে ধরেছে চারদিক থেকে। মনে হয় একটা অসভ্য নোংরা সমাজ আমাকে চারপাশ থেকে আক্রমণ করছে তীব্র চিৎকার করতে করতে।

এই ধরুন না ইউ টিউবে একটা মোল্লা রয়েছে রাজ্জাক বিন ইউসুফ কিংবা এই তো সেদিন একটা ভিডিও দেখলাম যেখানে এক মোল্লা বলছে একটা কুকুরের ৭ টা বাচ্চা হতে ডাক্তার লাগেনা কিন্তু একজন নারীর কেন লাগে? আবার রাজ্জাক বিন ইউসুফ নামের এই নোংরা মোল্লাটি বলছে নারীদের পেটাতে, মারতে, বিক্রি করতে কিংবা তাদের ঘরের বাইরে যেতে না দিতে। কথায় কথায় কোরান শরীফ আর হাদীস আওড়ে সে তার ওয়াজগুলোতে প্রমাণ করে দেবার চেষ্টায় রত রয়েছে যে নারী মানেই পাপের ভান্ডার আর নারী মানেই হচ্ছে বিপদ। অথচ এই লোকগুলোই একজন নারীর পেটে ৯ মাস ধরে বেঁচে বর্তে থেকে জন্ম নিয়েছে, এই পৃথিবীর আলো আর হাওয়াতে বড় হয়ে এখন সেই নারীকেই বিষাক্ত বলে অভিহিত করছে। বেঈমান বা মোনাফেক তাহলে আসলে কে? হুমায়ুন আজাদ তার একটা কবিতায় বলেছেন,

“যে তুমি ফোটাও ফুল,

বনে বনে গন্ধ ভরপুর;

সেই তুমি কেমন ক’রে বাঙলা

সে তুমি কেমন ক’রে…

দিকে দিকে জন্ম দিচ্ছো-

পালেপালে শুয়োর কুকুর”

একজন নারী নাকি ঘরের বাইরে নিরাপদ নয় সে জন্যই মোল্লারা নারীদের ঘরে শেকল পরিয়ে বন্দী করিয়ে রাখতে চাইছেন। কিন্তু প্রশ্ন এসেই যায়, এই নারীরা ঠিক কাদের জন্য নিরাপদ নয় ঘরের বাইরে? বাঘের জন্য? সাপের জন্য? গন্ডারের জন্য? ভাল্লুকের জন্য?

না। উত্তর হচ্ছে, এই পুরুষদের জন্যই নারীরা ঘরের বাইরে নিরাপদ নয়। যদি তাই বাস্তব ঘটনা হয়ে থাকে তাহলে কয়টা মোল্লাকে আপনি বলতে শুনেছেন যে পুরুষ তুমি ঘরের বাইরে যেয়ো না, পুরুষ তুমি নিজে ভালো চিন্তা করো, নিজে ভালো হয়ে ওঠো। আপনারা এসব মোল্লাদের মুখেও শোনেন নি, আপনারা এসব তথাকথিত সেই নোংরা চিন্তা সম্বলিত পুরুষদের মুখেও শোনেন নি। ইনফ্যাক্ট, শুনবেনও না।

নারীদের অধিকার, নারীদের চিন্তা, নারীদের অবস্থান এসব সব কিছু নারীদের নিশ্চিত করতে হবে। ঘরে এসে কেউ অধিকার-টধিকার দিয়ে যাবেনা আপনাকে। যে সমাজ নারীদের একটু বয়সেই স্বপ্ন দেখায় একটি সংসারের, দুই কাঁধ ভর্তি সন্তানের আর ঘর গেরস্থালীর সেই সমাজ এই নারীকেই ভাঙতে হবে। যে সমাজ এভারেস্টের চুড়োতে নারী উঠলে তাকে নিয়ে অকথ্য সমালোচনা করে সেই সমাজকে টুকরো টুকরো করে দিতে হবে আঘাত করে। যে সমাজে পুরুষ বউ পেটায়, নির্যাতন করে, কষ্ট দেয়, চাপিয়ে দেয় সেই সমাজ আপনার শক্ত চিন্তার প্রবল গতির শক্তিতে হামলা চালিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে যে আপনি এসব মানেন না। আপনি এসব মানতে জানেন না। আপনাকে বুঝিয়ে দিতে হবে এই সমাজে আপনি একা নন। এই সমাজে আপনাকে নিজের অবস্থান নিজেকেই গড়ে নিতে হবে।

সেদিন বলিভিয়া নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি দেখছিলাম। দেখলাম তাদের রাজধানী লা পাজ-এ শুধু মেয়েরাই ব্যবসা করছে, কাজ করছে। বলা হয় লা পাজ এর নারীরা এই শহর চালায়। তারাই শক্তিময়। এইযে এই একটা বলয়, এটি একদিনে তৈরী হয়নি। এক মুহুর্তে প্রস্তুত হয়নি। কিন্তু তারপরেও ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে লা পাগ-এর সমস্ত অর্থনৈতিক শক্তি নারীদের হাতে থাকাও কি আসলে অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করে কিনা। আমি মানি অর্থনৈতিক শক্তি একটা বিরাত ব্যাপার কিন্তু সেখানেই চাই চেক এন্ড ব্যালেন্স প্রক্রিয়া। কেউ বেশী বা কেউ কম সেটিও আসলে কোনো শুভ সংবাদ নয়। নারী আর পুরুষ যখন এই দুইটি অংশ একজন আরেকজনকে মানুষ গণ্য করে একজন আরেকজনের প্রতি সদয় হবে, এম্প্যাথাইজড হবে, তখনই একটি শক্তিশালী সমাজ জন্ম নেবে।

যে পুরুষ নারীর পেট থেকে জন্মে সে যেন পরবর্তী জীবনে নারীকে অসম্মান না করে, সেই পঠনটাও দেবে নারী। নারী যেন সন্তানের প্রতি এই বোধটুকু ঢুকিয়ে দেয় যে সমাজে বৈষম্যের স্থান নেই, থাকতে পারেনা।

অনেকেই বলেন একজন নারীর সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানেন না? কিংবা নারীকে সম্মান দিয়ে কথা বলুন। আমি আসলে সুনির্দিষ্টভাবে এইভাবে ভাবতে নারাজ। নারীকে সম্মান দিয়ে কথা বলার ভেতরে আলাদা কায়দা কানুনের কিছু নেই। চিন্তাটি হতে হবে, “মানুষকে সম্মান দিয়ে কথা বলুন। তাঁর সাথে বিনয়ী হন” শুধু নারীর প্রতি আলাদা ব্যবহারের কায়দা কানুনের প্রশ্নে আমার মনে হয় নারীরা নিজেদের আলাদা একটা অবস্থান চাইছেন, যেটা আমার দৃষ্টিতে সঠিক নয়। অধিকার হক সবার জন্য সম্মান। চাওয়ার হোক সবার জন্য সমান।

অবশ্য বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নারীদের জন্য এই আলাদা মর্যাদাটুকু চাইবারও বোধকরি কিছু কারন রয়েছে। এই জনপদে নারীরা যেভাবে যুগের পর যুগ নিগৃহীত হয়েছে বা বৈষম্যের শিকার হয়েছে সেটির রিটালিয়েশনেই হয়ত এমন একটা বাক্য বা ধারনার তৈরী হয়েছে।

কিন্তু তারপরেও আমি বলব, নারী আর পুরুষের ধারনার উর্ধ্বে গিয়ে মানুষের সম-অধিকারের প্রশ্নটি হোক বরং ব্যাপক উচ্চকিত এবং প্রধান।

Comments

comments

এমন আরো খবর:

Web developed by: AsadZone.Com

Send this to a friend