নিবন্ধন : ডিএ নং- ৬৩২৯ || শনিবার , ২৪শে আগস্ট, ২০১৯ ইং , ৯ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২২শে জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

১.
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম আত্মাহুতি দেয়া মহান বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। বিপ্লবী বাংলার নারী সমাজের মূর্তপ্রতীক সাহসিকা প্রীতিলতার জন্মগ্রহণ করেন চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে ১৯১১ সালের ৫ মে। মহান বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। উল্লেখ্য যে, মাস্টারদা’র নেতৃত্বে ১৯৩২ সালের ২৩ মতান্তরে ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে চট্টগ্রামের ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণে সফল হন প্রীতিলতাসহ বিপ্লবীরা। আক্রমণ শেষে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় একজন অফিসারের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন। প্রীতিলতা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, ব্রিটিশদের হাত থেকে বাঁচতে ক্লাব আক্রমণের পরেই তিনি আত্মহনন করবেন, আর তাই পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্লাব আক্রমণ শেষে তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। সহযোদ্ধা কালীকিংকরকে নিজের কাছে থাকা রিভলবার ফেরত দিয়ে পটাশিয়াম সায়ানাইড নেন। এ অবস্থায় ধরা পড়ার আগে সঙ্গে রাখা সায়ানাইড বিষ খেয়ে স্বদেশের মুক্তির জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দেন তিনি।

২.
বয়স কত? একুশ। পরনে মালকোঁচা ধুতি। মাথায় গৈরিক পাগড়ি, গায়ে লাল ব্যাজ লাগানো শার্ট। ইনিই দলনেতা। এক হাতে রিভলবার, অন্য হাতে হাতবোমা। দলের সদস্যসংখ্যা সাত। সবার পরনে রাবার সোলের কাপড়ের জুতো। সবাই প্রস্তুত। দলনেতার মুখে ‘চার্জ’ শুনতেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল শত্রুর ওপর। তারা তখন ক্লাবে মত্ত নাচ-গানে। পিকরিক অ্যাসিডে তৈরি বোমাটি বর্জ্রের মতো ভয়ংকর শব্দে ফেটে পড়ল; হলঘরে তখন শুধু ধোঁয়া। দলনেতাই এগিয়ে গেল সবার আগে। অথচ এটাই তার প্রথম অভিযান। বোমার বিস্ফোরণ, গুলির শব্দ, শত্রুর মরণ চিৎকার- সব মিলে এলাকাটা যেন পরিণত হলো এক দক্ষযজ্ঞে! এটা কোনো অ্যাডভেঞ্চার ফিল্মের দৃশ্য নয়। এটি ইতিহাসের এক অনন্য ঘটনা। আমরা আরও রোমাঞ্চিত হই- যখন জানি, ২১ বছরের সেই দলনেতা পুরুষ বেশে একজন নারী! বাংলাদেশেরই নারী! নাম প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। ১৯৩২ সাল। যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই বাঙালি নারী। তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ‘প্রীতিলতা’। আত্মদান করে প্রমাণ করেছেন, মেয়েরাও পারে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে। এইসব আত্মদানই আমাদের কে ব্রিটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত করেছে, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জনের পথে এগিয়ে দিয়েছে । এক প্রীতিলতা আজ বেঁচে আছেন বাংলার প্রতিটা সংগ্রামি তরুণ-তরুণীর অন্তরে।

৩.
ভারত উপমহাদেশের অগ্নিযুগের বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা থেকেই অনেক নারী প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ‘অনুশীলন’, ‘যুগান্তর’ প্রভৃতি বিপ্লবী দলের সঙ্গে ঘরে ঘরে মা, বোন, মাসিমা, কাকিমা, দিদি, বৌদিরা যুক্ত ছিলেন। যেমন ছিলেন অগ্নিযুগের প্রথম পর্বে স্বর্ণ কুমারী দেবী, সরলা দেবী, আশালতা সেন, সরোজিনী নাইডু, ননী বালা, দুকড়ি বালা, পরবর্তীকালে ইন্দুমতি দেবী, লীলা রায়, পটিয়া ধলঘাটের সাবিত্রী দেবী প্রমুখ দেশপ্রেমিক নারী। তারই ধারাবাহিকতায় সেই অগ্নিযুগের অগ্নিকন্যা, বীর কন্যা প্রীতিলতার আবির্ভাব।

৪.
বিপ্লবী বাংলার নারী সমাজের মূর্তপ্রতীক সাহসিকা প্রীতিলতার জন্ম ১৯১১ সালের ৫ মে। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে। এখানে জন্ম হয়েছে অসংখ্য বিপ্লবীর। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এই গ্রাম ছিল বিপ্লবীদের প্রধান ঘাঁটি। প্রীতিলতার বাবার নাম জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল অফিসের প্রধান কেরানী। বাবার মৃত্যুর পর জগবন্ধু শৈশবে পৈত্রিক বাড়ী ডেঙ্গাপাড়া ত্যাগ করে মায়ের সাথে পটিয়া থানার ধলঘাট গ্রামে চলে আসেন। ধলঘাট ছিল তাঁর মামা বাড়ি। এখানেই তিনি বড় হন এবং বসতি স্থাপন করেন। মা প্রতিভাদেবী ছিলেন গৃহিণী। জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার ও প্রতিভাদেবীর পরিবারে ছয় সন্তানের জন্ম হয়। মধুসূদন, প্রীতিলতা, কনকলতা, শান্তিলতা, আশালতা ও সন্তোষ। জগবন্ধু পরিবারের আদি পদবী ছিল দাশগুপ্ত। তাঁদের বংশের কোনো এক পূর্বপুরুষ নবাবী আমলে ‘ওয়াহেদেদার’ উপাধি পেয়েছিলেন। সেই ওয়াহেদেদার থেকে ওয়াদ্দেদার বা ওয়াদ্দার হয়।

৫.
প্রীতিলতার পড়াশুনার হাতেখড়ি বাবা, মায়ের কাছে। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। যে কারণে জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার মেয়েকে ১ম ও ২য় শ্রেণিতে ভর্তি না করিয়ে ডা. খাস্তগীর উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে সরাসরি তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করান। এটি ওই সময়ের অন্যতম নারী শিক্ষালয় ছিল। এই নামকরা স্কুলে প্রতিটি শ্রেণীতে তিনি প্রথম কিংবা দ্বিতীয় ছিলেন। ৮ম শ্রেণীতে প্রীতিলতা বৃত্তি পান। ওই স্কুল থেকে প্রীতিলতা ১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাস করার পর ভর্তি হন ঢাকার ইডেন কলেজে। থাকেন কলেজের ছাত্রীনিবাসে। এ সময় প্রীতিলতা বিপ্লবী লীলা নাগের সংস্পর্শে আসেন। তখন বিপ্লবী লীলা নাগের নেতৃত্বে ‘দীপালী সংঘ’ সংগঠনটি পরিচালিত হত। দীপালী সংঘ ছিল ‘শ্রীসংঘ’-এর মহিলা শাখা সংগঠন। ‘শ্রীসংঘ’ ছিল তখনকার ঢাকার একটি বিপ্লবী দল। লীলা নাগের সাথে প্রীতিলতার ‘দীপালী সংঘ’ নিয়ে কথা হল। কথাবার্তার মাধ্যমে লীলা নাগ বুঝে নিলেন প্রীতিলতাকে দিয়ে দেশের কাজ হবে। তাই লীলা নাগ তাঁকে ‘দীপালী সংঘে’র সদস্য হওয়ার জন্য একটি ফর্ম দিয়ে বললেন, ‘তুমি এর উদ্দেশ্য ও আদর্শের সাথে একমত পোষণ করলে বাড়ী থেকে এসে ফর্মটি পূরণ করে দিও।’ বাড়ী আসার পরের দিন তিনি ওই ফর্মটি পূর্ণেন্দু দস্তিদারকে দেখিয়ে বললেন, “দাদা, আমি এই সংঘের সাথে কাজ করবো। তোমরা তো আর আমাকে তোমাদের দলে নিবে না, তাই এখানে যুক্ত হয়ে আমি দেশের জন্য কাজ করব। পূর্ণেন্দু দস্তিদার ওই ফর্মটি প্রীতিলতার কাছ থেকে নিয়ে গেলেন এবং বললেন, দলনেতাকে দেখিয়ে তোমাকে এটি ফেরত দিব”। ১৯২৯ সাল। তখন সূর্যসেন চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক। পূর্ণেন্দু দস্তিদার প্রীতিলতার কাছ থেকে ফর্মটি নেয়ার পরের দিন বিকেল বেলা বিপ্লবীদের গোপন বৈঠকে উপস্থিত হলেন। বৈঠক শেষে জেলা কংগ্রেসের কার্যালয়ে তিনি মাষ্টারদা সূর্যসেনকে ওই ফর্মটি দেখালেন এবং প্রীতিলতার মনের কথাগুলো বললেন। মাষ্টারদা সূর্যসেন সবকিছু শুনে পূর্ণেন্দু দস্তিদারকে বললেন, আজ থেকে আমরা প্রীতিলতাকে আমাদের দলের সদস্য করে নিলাম। কিন্তু এই কথা আপাতত আমরা তিনজন ছাড়া অন্য কাউকে জানানো যাবে না। প্রীতিলতাকে একদিন আমার কাছে নিয়ে এসো।

৬.
আই.এ. পরীক্ষা শেষ করে প্রীতিলতা চট্টগ্রামে চলে আসেন। সূর্যসেনের সাথে প্রীতিলতার ভবিষৎ কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা হয়। কিছুদিন পর প্রীতিলতার আই.এ. পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। মাসিক ২০ টাকা বৃত্তি পাবেন তিনি। ঠিক হলো কলকাতার বেথুন কলেজে পড়াশুনা করবেন। ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে বি.এ. ভর্তি হলেন প্রীতিলতা। থাকেন ছাত্রীনিবাসে। এখানে মাষ্টারদার নির্দেশে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড শুরু করলেন তিনি। গড়ে তুললেন এক বিপ্লবী চক্র। এই বিপ্লবী চক্রে অনেক মেয়ে সদস্য যোগ দিলেন। তাঁদের মূল কাজই হলো অর্থ সংগ্রহ। অর্থ সংগ্রহ করে প্রীতিলতা চট্টগ্রামে পাঠাতে লাগলেন। কলকাতার এক গোপন কারখানায় তখন তৈরি হয় বোমার খোল। মাষ্টারদার নির্দেশ অনুযায়ী সেই বোমার খোল সংগ্রহ করতেন প্রীতিলতা।

৭.
১৯২৯ সালে পূজার ছুটিতে কল্পনা দত্ত, সরোজিনি পাল, নলিনী পাল, কুমুদিনী রক্ষিতকে নিয়ে প্রীতিলতা চট্টগ্রাম আসেন। বোমার খোলগুলো পৌঁছে দেন বিপ্লবীদের হাতে। মাষ্টারদার নির্দেশ অনুযায়ী প্রীতিলতা এরপর প্রকাশ্য বিপ্লবী কাজে যুক্ত হয়ে পড়েন। অনেক দায়িত্বপূর্ণ কাজের ভারও তাঁকে নিতে হয়। কলকাতায় যে বিপ্লবী চক্র গঠন করা হয়েছে, তাঁদের সকল প্রকার প্রশিক্ষণও প্রীতিলতাকে দিতে হতো। বি.এ. শেষ বর্ষে পড়ার সময় চট্টগ্রামের অস্ত্রগার দখল, জালালাবাদ সংঘর্ষ ও সেই যুদ্ধে তাঁর আত্মীয় শহীদ হওয়ায় লেখাপড়ায় তিনি অমনোযোগী হয়ে ওঠেন এবং রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসির পর থেকে তিনি বি.এ. পরীক্ষা না দেয়ার জন্য মনস্থির করেন। কিন্তু তাঁর শুভাকাংক্ষীদের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত বি.এ. পরীক্ষা দিয়ে ১৯৩২ সালে তিনি ডিসটিংশনে পাস করলেন। কিন্তু ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে তার সনদ বাতিল করে দেয়া হয়। ২০১২ সালের ২২ মার্চ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তাকে মরণোত্তর স্নাতক ডিগ্রী প্রদান করা হয়।

৮.
১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মহানায়ক সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম দখল হলো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রামে ইংরেজ শাসন অচল হয়ে গেলো। টেলিগ্রাফ-টেলিফোন বিকল, সরকারি অস্ত্রাগার লুন্ঠন, রিজার্ভ পুলিশ ছত্রভঙ্গ ও রেললাইন উপড়ে ফেলা হলো। স্বদেশী বিপ্লবীরা চট্টগ্রাম শহর দখল করে ফেলেছে। এ সময় প্রীতিলতা কলকাতায়। চট্টগ্রামে আসার জন্য ব্যাকুল। সশস্ত্র বিপ্লবে অংশগ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু তখনো পর্যন্ত মাষ্টারদার অনুমতি মেলেনি। বি.এ. পরীক্ষা শেষে মাষ্টারদার নির্দেশে স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে চলে আসেন। ১৯৩২ সালে বি.এ. পাস করার পর চট্টগ্রাম অপর্ণাচরণ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এ সময় বিপ্লবী কাজে আরো বেশি সক্রিয় হওয়ার তাগিদ দিলেন মাষ্টারদা সূর্যসেন।

৯.
১৯৩২ সালের মে মাসে প্রীতিলতার জন্মস্থান ধলঘাটে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে মাষ্টারদা তাঁর সহযোদ্ধাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করেন। এই বৈঠক চলার সময় ব্রিটিশ সৈন্যদের সাথে বিপ্লবীদের বন্দুক যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে প্রাণ দেন নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন। সূর্যসেন প্রীতিলতাকে নিয়ে বাড়ির পাশে ডোবার পানিতে ও গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন। সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর মাস্টারদা বলেন, ‘প্রীতি, তুমি বাড়ি ফিরে গিয়ে স্কুলের কাজে যোগ দেবে, তাহলে গত রাতের ঘটনায় কেউ তোমাকে সন্দেহ করবে না।’ সাবিত্রী দেবীর বাড়িটি পুলিশ পুড়িয়ে দেয়। এই ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকার প্রীতিলতাকে সন্দেহ করা শুরু করে। মাষ্টারদার নির্দেশে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। অন্য একটি বিপ্লবী গ্রুপ ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে ব্যর্থ হয়। যার কারণে মাষ্টারদা প্রীতিলতাকে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে বলেন। এই জন্য কাট্টলি সমুদ্র সৈকতে বিপ্লবী দলকে মাষ্টারদা সামরিক প্রশিক্ষণ দেন।

১০.
১৯৩২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কাট্টলী গ্রামে এক গোপন বৈঠকে মাস্টারদার নির্দেশে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা করার জন্য একটি গ্রামের উদ্দেশ্যে পুরুষের বেশে রওনা দেন। কিন্তু পথে পাহাড়তলীতে কল্পনা দত্ত ধরা পড়েন। প্রীতিলতা নিরাপদে নির্দিষ্ট গ্রামে এসে পৌঁছেন। এখানেই প্রীতিলতার নেতৃত্বে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করার পরিকল্পনা নেয়া হয়।

আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য কাট্টলীর সাগরতীরে প্রীতিলতা ও তাঁর সাথীদের অস্ত্র শিক্ষা শুরু হয়। প্রশিক্ষণ শেষে বীরকন্যা প্রীতিলতার নেতৃত্বে বিপ্লবীরা প্রীতিলতা ও তার বিপ্লবী সহযোদ্ধারা পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ইউরোপিয়ান ক্লাব ছিল ব্রিটিশদের আমোদ প্রমোদের জায়গা। মাস্টারদা সূর্য সেন প্রীতিলতাকে এই আক্রমণ অভিযানের দায়িত্ব দেন। ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণে সফল হন বিপ্লবীরা। প্রীতিলতার সাথে এই অভিযানে আরও ছিলেন কালী কিংকর, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্লদাস, শান্তি চক্রবর্তী, মহেন্দ্র চৌধুরী, সুশীল দে, পান্না সেন। ইউরোপিয়ান ক্লাবের পাশে পাঞ্জাবীদের কোয়ার্টার ছিল। তাই সন্দেহ এড়াতে প্রীতিলতা পাঞ্জাবী পুরুষের ছদ্মবেশ ধারণ করেন। তার সহযোদ্ধাদের কয়েকজনও ধুতি, লুঙ্গি আর শার্ট পরে ছদ্মবেশ নেন। বিপ্লবীদের আশ্রয়দাতা যোগেশ মজুমদার প্রথমে ক্লাবে প্রবেশ করেন। আনুমানিক রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে তিনি আক্রমণের সঙ্কেত দেন। এরপরই ক্লাব আক্রমণ শুরু হয়। প্রীতিলতা হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ করেন। আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বিপ্লবীদের আক্রমণে ক্লাবের সবাই ভীতসস্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ক্লাবে উপস্থিত কয়েকজন ইংরেজ অফিসার রিভলবার দিয়ে পাল্টা আক্রমণ চালায়। আক্রমণ শেষে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় একজন অফিসারের গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন। প্রীতিলতা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, ব্রিটিশদের হাত থেকে বাঁচতে ক্লাব আক্রমণের পরেই তিনি আত্মহনন করবেন তাই পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্লাব আক্রমণ শেষে তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। সহযোদ্ধা কালী কিংকরকে নিজের কাছে থাকা রিভলবার ফেরত দিয়ে পটাশিয়াম সায়ানাইড নেন। এ অবস্থায় ধরা পড়ার আগে সঙ্গে রাখা সায়ানাইড বিষ খেয়ে আত্মাহত্যা করেন তিনি। কারণ ধরা পড়লে বিপ্লবীদের অনেক গোপন তথ্য ব্রিটিশ পুলিশের মারের মুখে ফাঁস হয়ে যেতে পারে। মৃত্যুর আগে তিনি তার আত্মহননের স্বীকারোক্তি দিয়ে এক বিবৃতি লিখে যান। এই বিবৃতিতে তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মুক্তি আন্দোলনের জন্য আত্মদানে অগ্রসর হন বলে উল্লেখ করেন। প্রীতিলতা মারা যাওয়ার আগে মায়ের কাছে লিখেছিলেন, ‘মাগো, অমন করে কেঁদোনা! আমি যে সত্যের জন্য, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে এসেছি, তুমি কি তাতে আনন্দ পাও না? কী করব মা? দেশ যে পরাধীন! দেশবাসী বিদেশির অত্যাচারে জর্জরিত! দেশমাতৃকা যে শৃঙ্খলভাবে অবনতা, লাঞ্ছিতা, অবমানিতা! তুমি কি সবই নীরবে সহ্য করবে মা? একটি সন্তানকেও কি তুমি মুক্তির জন্য উৎসর্গ করতে পারবে না? তুমি কি কেবলই কাঁদবে?’ পরদিন পুলিশ ক্লাব থেকে ১০০ গজ দূরে প্রীতিলতার মৃতদেহ পড়ে থাকে। পরবর্তীতে পুলিশ তার মৃতদেহ শনাক্ত করে ময়নতদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়। গুলির আঘাতে নয়, পটাশিয়াম সায়ানাইড ছিল প্রীতিলতার মৃত্যুর কারণ এমনটি উল্লেখ করা হয় ময়নাতদন্তের রিপোর্টে।

১১.
প্রীতিলতার মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের অবস্থা নিয়ে কল্পনা দত্ত লিখেছেনঃ“প্রীতির বাবা শোকে দুঃখে পাগলের মত হয়ে গেলেন, কিন্তু প্রীতির মা গর্ব করে বলতেন, ‘আমার মেয়ে দেশের কাজে প্রাণ দিয়েছে’। তাঁদের দুঃখের পরিসীমা ছিল না, তবু তিনি সে দুঃখেকে দুঃখ মনে করেননি। ধাত্রীর কাজ নিয়ে তিনি সংসার চালিয়ে নিয়েছেন, আজো তাঁদের সেভাবে চলছে। প্রীতির বাবা প্রীতির দুঃখ ভুলতে পারেননি। আমাকে দেখলেই তাঁর প্রীতির কথা মনে পড়ে যায়, দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন”।

১২.
পরাধীনতার হাত থেকে প্রিয় স্বদেশকে মুক্ত করার জন্য সংগ্রাম করেছেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। স্বাধীনতা লাভের স্বপ্ন নিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছেন এই বিপ্লবী নারী। দেশপ্রেম আর স্বদেশের মঙ্গল চিন্তায় এই মহীয়সী নারী যুগে যুগে আমাদের আদর্শ আর অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন। নারীরা যখন পুরুষ শাষিত, শোষিত-বঞ্চিত-নির্যাতিত ও নিপীড়িত-নিষ্পেষিত তখনি দুঃসাহসি ভূমিকায় আবির্ভূত সংগ্রামী চেতনায় অগ্নি মন্ত্রে এগিয়ে এসেছিলেন চট্টগ্রামের সাহসী নারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। নারী জাগরণের দিব্য প্রদীপ শিখা জ্বেলে সংগ্রাম ও চেতনায় নারী সমাজকে জাগিয়ে তোলেন সাহসী এ নারী। আজ নারীরা সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে। শোষণ-বঞ্চনার বাঁধ ভেঙ্গে নারীরা আজ বাঁধাহীন। নারীরা এগিয়ে যাওয়ার পথে সাহসিকা প্রীতিলতার ভূমিকা অগ্রগামী। তাই অনায়াসে বলা যায়, নারী জাগরণের মূর্ত প্রতীক সাহসিকা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নারী সৈনিক প্রীতিলতা। প্রীতিলতা ব্রিটিশদের হাত থেকে দেশকে স্বাধীন করার জন্য নিজেকে গড়ে তোলার পাশাপশি অসংখ্য বিপ্লবীদের প্রশিক্ষিত, অনুপ্রাণিত ও উজ্জীবিত করে গেছেন। জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি মহান বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের প্রতি। সেই সাথে কামনা প্রীতিলতার সকল স্বপ্নের জয় হোক।

(তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, ইন্টারনেট)

Comments

comments

এমন আরো খবর:

Web developed by: AsadZone.Com

Send this to a friend