নিবন্ধন : ডিএ নং- ৬৩২৯ || বৃহস্পতিবার , ২৪শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ৯ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২৩শে সফর, ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

কথাসাহিত্যের বিস্ময়কর প্রতিভা মঈনুল আহসান সাবের

কথাসাহিত্যের বিস্ময়কর প্রতিভা মঈনুল আহসান সাবের

আমাদের কথাসাহিত্যের বিস্ময়কর প্রতিভা, শক্তিমান লেখক মঈনুল আহসান সাবেরের মতো হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ আছেন, বয়স বাড়ার সাথে তাঁদের চিন্তা, মানসিক শক্তি, নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধ আরও প্রবলতর হয়। বয়স মানুষকে কাবু করতে পারে না সেটি সাবের দাদাকে কাছ থেকে দেখেছি বলেই বুঝতে পারি। তাই সৃষ্টিশীল লেখক ও প্রকাশক সত্তার এতোখানি সক্রিয়তা তাঁর সমকালে বিরল বলেই মনে হয়। তিনি নিজেকে প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করে চলেছেন সময়ের কথক এবং বর্ণনাকারী হিসেবে।

মঈনুল আহসান সাবেরের পিতা স্বমহিমায় বিখ্যাত কবি আহসান হাবীব ছিলেন আমাদের সাহিত্যের সত্যিকার অভিভাবক ও জ্ঞানতাপস। সম্পাদক হিসাবে তিনি ছিলেন চুড়ান্ত নির্মোহ এবং আপোষহীন। তাঁর এই আপোষহীন মানসিকতা তাঁকে এমন এক স্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল যে আজও পর্যন্ত্য তাঁর প্রতিতূল্য ব্যক্তি একমাত্র তিনি নিজেই। অনবদ্য এই গুণের জন্য দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদনার ইতিহাসে তাঁর বিকল্প খুঁজে পাওয়া বিরল। অতোবড় কবি ও সম্পাদকের সন্তান মঈনুল আহসান সাবের কবিতাকে বেছে না নিয়ে পেশা হিসেবে নিলেন সাংবাদিকতাকে। কালক্রমে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলা মূলধারার কথা সাহিত্যের একজন জনপ্রিয় কথাশিল্পী। এছাড়া প্রকাশক হিসেবেও তাঁর সুখ্যাতি রয়েছে।

মঈনুল আহসান সাবের জন্ম ২৬শে মে, ঢাকা শহরে। পৈতৃক ভিটে একদা বরিশাল। এখন ভাগ হয়ে যাওয়ার পর পিরোজপুর। তবে, যদিও প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ বাংলাদেশের প্রায় পুরোটাই ঘুরেছেন, ওই পিরোজপুরেই তার যাওয়া হয়নি। সম্ভবত যাবেনও না, বাবার ফেলে আসা জায়গাটা ভূমিহীন সাবের কল্পনায় সাজিয়ে রেখেছেন। জন্ম, বড় হওয়া, লেখাপড়া, লেখালেখি, কর্ম ও সংসারজীবন এই এখানেই। ঢাকার নাগরিক দিকটা তাই দেখেছেন কাছ থেকে। অনায়াসে দেখেছন, তাই নাগরিক জীবনের ছোটখাট দিকগুলোও দৃষ্টি এড়ায়নি। লেখাপড়া করেছেন গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুল, ঢাকা কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সমাজবিজ্ঞানে এমএসএস। তবে, পুরনো কথা যদিও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাকে যত না টেনেছে, তার চেয়ে বেশি টেনেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চত্বর। বড়দের জন্য লেখালেখির শুরু ১৯৭৪ সালে। ও-বছর ২৮শে জুন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ছাপা হয়েছিল প্রথম গল্প ‘মোহনী তমসা’। তখন তিনি এইচএসসির প্রথম বর্ষে। তারপর বিরতিহীন ও বিরতিসহ লেখালেখি। প্রথম বই গল্পগ্রন্থ ‘পরাস্ত সহিস’ বেরিয়েছিল ১৯৮২ সালে।

মঈনুল আহসান সাবের সম্পর্কে মনস্বী সাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, “ব্যক্তিজীবনে যেমন, লেখালেখিতেও তেমন, সাবেরকে নিয়ে আমার আশাবাদের, ভরসার, শ্রদ্ধার এবং ভালোবাসার জায়গাটাও এই- তার কোনো হুকুম-না-শোনা জীবনবাদ, তার দুর্বিনীত তারুণ্য, সমাজ-দেশ-কাল নিয়ে তার পরিষ্কার চিন্তা-ভাবনা। এ কথাটা খবরের কাগজের সবচেয়ে সাবধানী কলামলেখকও স্বীকার করবেন যে, দেশে উগ্রচিন্তার প্রসার ঘটেছে, সংস্কৃতির ওপর আঘাত আসছে, প্রগতিশীল ভাবনা-চিন্তা আক্রান্ত হচ্ছে। এখন পাঠ্যপুস্তক থেকে নিয়ে ক্ষমতার বয়ানও সাম্প্রদায়িকতায় দুষ্ট। এ রকম সময়ে যা মনকে জাগাতে পারে, চিত্তকে মুক্ত করতে পারে, সংস্কৃতির শক্তিতে কল্পনা ও সৃজনশীলতাকে আরও বলিষ্ঠ করতে পারে, তা যারা দিতে পারেন, তাদের প্রয়োজনটাই সবচেয়ে বেশি। সাবেরের লেখালেখি সেই কাজটি নিরন্তর করে যাচ্ছে। এ জন্য এই মানুষটি আমাদের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ। তার ষাটত্ব পাওয়াকে আমরা উদযাপন করি আমাদের সাহিত্য এবং সংস্কৃতির জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে। সাহিত্য এবং সংস্কৃতির যা কিছু সুন্দর, যা কিছু জীবনকে মহিমা দেয়, নন্দনচিন্তাকে জাগায়, এই মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা সেসবকেই উদযাপন করি।

মঈনুল আহসান সাবেরের লেখালেখি এক প্রচণ্ড জীবনশক্তিকে ধারণ করে। বাস্তবতার ছবিই তিনি আঁকেন; কিন্তু এই আঁকার মধ্য দিয়ে আমাদের ইতিহাসের, সমাজের, জীবনের, প্রাত্যহিকতার প্রতিটি শক্তিবিন্দুকে একত্র করেন। পাঠক বোঝেন, বাংলাদেশ নামক এক ভূখণ্ডের কোনো টুকরো টুকরো ছবি নয়, বরং এক পূর্বাপর সম্পর্কিত, ইতিহাসের ক্রমবিবর্তনে জড়িত এবং জারিত, এর আশা-নিরাশা-ভালোবাসার চিহ্নগুলো ধারণ করা চলমান আখ্যান তিনি তার লেখালেখিতে হাজির করেন।”

রাশভারী এবং খুব গুরুগম্ভীর বিষয়ই তাঁর কথাসাহিত্যের উপজীব্য। কিন্তু উপস্থাপন এত আটপৌরে যেন বহুদিনের এক বন্ধুর সঙ্গে গল্প করতে বসেছেন। সেই বন্ধু গল্প বলছেন অন্য বন্ধু সেই গল্পের ভেতরে ঢুকে নিজেও অংশগ্রহণ করছেন। অভিমত দিচ্ছেন। এই যোগাযোগী ক্ষমতা বোধ করি মঈনুল আহসান সাবেরের কথাসাহিত্যের অন্যতম একটি গুণ। এই গুণ থাকাতে পাঠক সহজেই ওই গল্পের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। কিন্তু এই যোগাযোগী ক্ষমতা সৃষ্টি হওয়ার পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে। যেমন, যে চরিত্রের কথা বলা হচ্ছে তিনি আমাদেরই সমাজের মানুষ, আমাদেই চেনা আত্মীয়, আমাদেরই দেখা বন্ধু। সেই মানুষের, সেই আত্মীয়ের সেই বন্ধুর বিপন্ন হওয়ার গল্প যখন বলা হয়, এবং এমন জীবন্ত এবং চাক্ষুষরূপে হাজির করা হয় তখন তো পাঠক একাত্ম না হয়ে পারে না। এভাবেই তিনি নিরলসভাবে নির্মাণ করে যাচ্ছেন আমাদের সমাজের বিশেষ বিশেষ আক্ষেপ। যে আক্ষেপ প্রায়শই আমাদের নিয়ে যায় সেই ব্যথার দিকে, যে ব্যথা প্রায়ই হিসাব করে কী হলো এবং কী হতে পারতোর বিয়োগফল।

প্রথম গ্রন্থ বের হওয়ার পরের বছরই বের হলো ‘অরক্ষিত জনপদ’ (১৯৮৩), ‘তারপর স্বপ্নযাত্রা’ (১৯৮৪), ‘আগমন সংবাদ’ (১৯৮৪), ‘একবার ফেরাও’ (১৯৮৫), ‘আগামী দিনের গল্প’ (১৯৮৭), ‘পাথর সময়’ (১৯৮৯), ‘কেউ জানে না’ (১৯৯০), ‘মানুষ যেখানে যায় না’ (১৯৯০), ‘কয়েকজন অপরাধী’ (১৯৯০), ‘এ এক জীবন’ (১৯৯১), ‘অগ্নিগিরি’ (১৯৯১), ‘অপেক্ষা’ (১৯৯২), ‘কবেজ লেঠেল’ (১৯৯২), ‘লজ্জা’ (১৯৯২), ‘এক ঝলক আলো’ (১৯৯৪), ‘মৌমাছি ও কাঠুরিয়া’ (১৯৯৬), ‘তিন সাংবাদিক ভূত’ (১৯৯৭), ‘অবসাদ ও আড়মোড়ার গল্প’ (১৯৯৯), ‘বৃষ্টি দিন’ (২০০০), ‘খুনের আগে ও পরে’ (২০০০), ‘এক একত্রে অপেক্ষা করছে’ (২০০১), ‘শরীরের গল্প’ (২০০৪), ‘সুকুমারের লজ্জা’ (২০০৫), ‘দুরের ওই পাহাড় চূড়ায়’ (২০০৬), ‘আখলাকের ফিরে আসা’ (২০১৪), ‘আবদুল জলিল যে কারণে মারা গেল’ (২০১৫), ‘এভাবেও লেখা হতে পারে আরেকটি গল্প’ (২০১৬) ইত্যাদি।

মঈনুল আহসান সাবের (১৯৫৮) মূলত নাগরিক জীবনের রূপকার। নাগরিক মধ্যবিত্তকে তিনি চিহ্নিত করেছেন তার প্রকৃত অবস্থান এবং শনাক্ত করেছেন তার রূপ-স্বরূপ। লেখক প্রচলিত ধারণাকে উপেক্ষা করে পর্যবেক্ষণ করেছেন মধ্যবিত্তের অন্তর্গত শূন্যতা এবং নির্মোহ দৃষ্টিতে চিত্রিত করেছেন বিপন্ন মধ্যবিত্তের আকাঙ্ক্ষা ও অতৃপ্তি। দ্বিধা ও গ্লানি, ক্ষয় ও ক্লান্ত, তীব্র হাহাকার ও বেদনা। মধ্যবিত্তের পাশাপাশি সমাজ সমকালের প্রেক্ষিতে নিম্নবিত্তের চালচিত্র আশ্চর্য নিরাসক্তিতে তিনি তুলে ধরেছেন।

গল্প, উপন্যাস, কিশোর রচনা, অনুবাদ, রূপান্তর—সব মিলিয়ে বই বোধহয় ৮০ ছাড়িয়েছে। সংখ্যাটা হয়তো বেশিই। লেখালেখির পরিসর তাঁর ব্যাপক বিস্তৃত। এ দিক থেকে বিবেচনা করলে মঈনুল আহসান সাবেরকে হয়তোবা বহুপ্রজ বলা যেতে পারে। কিন্তু বহুপ্রজ হওয়ার যে প্রবল ঝুঁকি থাকে তার ভেতর তাঁকে কখনো পড়তে দেখা যায় না। বহুপ্রজ হওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো মনোনিবেশের ঘাটতিজনিত কারণে লেখার গাঁথুনি শিথিল হয়ে যাওয়া। তবে, আশার কথা এই যে, এইসব দুর্বলতা মঈনুল আহসান সাবেরের কোনো রচনাকে কখনোই স্পর্শ করে না। চাকরি জীবনে সাংবাদিকতা ছাড়া আর কিছুই করা হয়নি তাঁর। অবশ্য বেকার থাকার অভিজ্ঞতাও তাঁর আছে। সম্ভব হলে আবার সেই বেকার থাকার জীবনেই ফিরতে চান। ছোটবেলায় ডাকটিকেট জমানো ছিল প্রিয় শখ। এখন ভ্রমণ।

সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন বেশ কয়েকটি। বাপী শাহরিয়ার শিশু সাহিত্য পুরস্কার, হুমায়ূন কাদির সাহিত্য পুরস্কার, ফিলিপ্‌স সাহিত্য পুরস্কার এবং বাংলা একাডেমি পুরস্কার, জেমকন সাহিত্য পুরস্কার, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার। সর্বশেষ যুক্ত হলো একুশে পদক-২০১৯। তবে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যা, তা হল- তিনি অর্জন করেছেন অসংখ্য বিমুগ্ধ পাঠক ও ঋদ্ধ সমালোচকের ভালোবাসা।

Comments

comments

এমন আরো খবর:

Web developed by: AsadZone.Com

Send this to a friend