নিবন্ধন : ডিএ নং- ৬৩২৯ || রবিবার , ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৭ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২২শে মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদনে মন্ত্রিসভার বৈঠক শুরু

প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদনে মন্ত্রিসভার বৈঠক শুরু

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদনে মন্ত্রিসভার বৈঠক শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার পর জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বিশেষ এ বৈঠক শুরু হয়।

‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ: সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’ শীর্ষক প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা।

মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন মিললে আজ বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন। এটি দেশের ৪৮তম ও বর্তমান সরকারের তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বাজেট। আর অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামালের এটি প্রথম বাজেট। যদিও গত সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে অনেক বাজেট প্রণয়নে পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন তিনি।

‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ : সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’- শিরোনামের এবারের বাজেট শুধু ১ বছরের জন্য নয়, তৈরি করা হয়েছে ২০৪১ সালকে টার্গেট করে। তবে এ বাজেট সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে সরকারকে মুখোমুখি হতে হবে নানা প্রতিকূলতার।

যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- প্রবৃদ্ধিতে অসমতা, বিনিয়োগ সংকট, সুশাসনের ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা, অর্থনীতির আকারে রাজস্ব আদায় কম, বৈদেশিক লেনদেন ঘাটতি।

তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অর্থমন্ত্রী প্রবৃদ্ধিকে আগামী ৩ বছরে ৮ দশমিক ৬ শতাংশের ঘরে নেয়ার স্বপ্ন দেখছেন। বিশাল ব্যয়কে মেলাতে গিয়ে উচ্চ রাজস্ব আদায়ের হিসাবও করেছেন তিনি।

শুধু তাই নয়, তিনি ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চান ৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধিকে টেনে নিতে চান ৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

আজ জাতীয় সংসদে যে বাজেট প্রস্তাব পেশ করা হচ্ছে, এর সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এ ব্যয় মেটাতে আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। আর অনুদানসহ আয় হবে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা।

আয় ও ব্যয়ের ফারাক ঘাটতি থাকবে (অনুদানসহ) ১ লাখ ৪১ হাজার ২১২ কোটি টাকা। আর অনুদান ছাড়া এ ঘাটতির পরিমাণ হবে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।

বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে নতুন আঙ্গিকে তৈরি করা হয়েছে এ বাজেট। এবারের বাজেটের আকার বাড়লেও অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা হবে সংক্ষিপ্ত। তবে এ বক্তৃতার একটি বর্ধিত সংস্করণ বাজেট বই আকারে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে, যা সর্বস্তরের জনসাধারণের জন্য হবে সহজপাঠ্য।

বাজেটের লক্ষ্য সুদূরপ্রসারী হলেও তা অর্জন করতে চেষ্টা হবে সাধ্যের মধ্যে। রাজস্ব আদায়ে করের হার না বাড়িয়ে বরং করের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে এবারের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ করতে এনবিআরের জন্য নতুন করে দিকনির্দেশনা থাকবে।

কাস্টমস আইন ও আয়কর আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে সহজবোধ্য ও ব্যবসাবান্ধব করা হবে। সব আমদানি-রফতানি পণ্য শতভাগ স্ক্যানিং করা হবে। নতুন বাজেটে শিক্ষা ও আর্থিক খাত সংস্কার, শেয়ার বাজারে সুশাসন ও প্রণোদনা প্রদান বিষয়ে দিকনির্দেশনা থাকবে।

বাজেটে শেষ পর্যন্ত কার্যকর করা হচ্ছে বহুল আলোচিত নতুন ভ্যাট আইন। যেটি প্রণয়ন করা হয়েছিল ২০১২ সালে। এতে ব্যবসায়ীরা স্বস্তিতে থাকলে কিছুটা ব্যয়ের চাপ বাড়তে পারে মধ্যবিত্ত পরিবারের। কারণ আইনটি কার্যকরের পর কিছু পণ্যের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত এর খেসারত ভোক্তাকে গুনতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে নতুন করে কোনো কর আরোপ করা হবে না- এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু জনগণকে করের বোঝা থেকে রক্ষা করতে তিনি নজর দেবেন নতুন করদাতার ওপর। করযোগ্য কিন্তু কর দিচ্ছেন না এমন ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এজন্য তিনি পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, আরও ৮০ লাখ জনকে কর জালের আওতায় আনা হবে। বর্তমানে করদাতার সংখ্যা ২০ লাখ।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায় ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারকে। জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও যুবকদের বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এটি নতুন বাজেটে প্রতিফলন ঘটানো হবে।

তরুণদের জন্য রাখা হয়েছে নানা ধরনের সুযোগ। বেকারদের কর্মসংস্থানের বিকল্প হিসেবে ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে ঋণ তহবিলের। এ বাজেটের মাধ্যমে অর্থমন্ত্রী ভোটারদের প্রতিদান দেয়ার চেষ্টা করবেন।

আরও জানা গেছে, বাজেট প্রস্তাবে থাকছে বেশকিছু নতুন চমক। এতে থাকছে বেকারদের জন্য ঋণ তহবিল (স্ট্যাট আপ ফান্ড)। এ তহবিল থেকে স্বল্প সুদে সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে পারবেন বেকাররা।

এছাড়া কৃষকদের জন্য ‘পাইলট প্রজেক্ট’ হিসেবে চালু করা হবে শস্যবীমা। প্রাথমিকভাবে বেছে নেয়া হবে একটি জেলাকে। পরে এটি ছড়িয়ে দেয়া হবে সারা দেশে। এছাড়া নতুন উদ্যোগের মধ্যে থাকছে প্রবাসীদের জন্য বীমা সুবিধা।

বর্তমানে বিদেশে ৭০ থেকে ৮০ লাখ প্রবাসী অবস্থান করছেন। আর প্রতি বছর নতুন করে দেশের বাইরে চাকরিতে যাচ্ছেন ৫ থেকে ৭ লাখ মানুষ। এদের বীমা সুবিধার আওতায় আনা হবে।

কারণ অনেকে বিদেশে গিয়ে চাকরি হারাচ্ছেন, দুর্ঘটনায় পঙ্গু ও নিহত হচ্ছেন। এছাড়া নানাভাবে প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরছেন। এসব ঝুঁকির কারণেই তাদের বীমার আওতায় আনা হবে।

নতুন বাজেটে যেসব খাতে ব্যাপক সংস্কারের প্রস্তাব করা হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ব্যাংকিং খাত, পুঁজিবাজার, সঞ্চয়পত্র ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। তবে সামগ্রিকভাবে করমুক্ত রাখা হবে জনগণকে। এতে আরও ঘোষণা থাকবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী বাজেটে ব্যয়ের বড় একটি অংশ যাবে পরিচালনা খাতে। এতে ব্যয় হবে ৩ লাখ ১০ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে আবর্তক ব্যয় হবে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা। যার একটি বড় অংশ ব্যয় হবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে।

আগামী অর্থবছরে এডিপি খাতে ব্যয় হবে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। আবর্তক খাতের আরও একটি অংশ ব্যয় হবে সুদ পরিশোধে। অর্থাৎ বিদেশ থেকে নেয়া ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় করা হবে ৪ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধ করা হবে ৫২ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা।

ব্যয়ের আরেকটি খাত হচ্ছে এডিপি বহির্ভূত প্রকল্প। এ খাতে ব্যয় হবে ৫ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন স্কিমে ব্যয় হবে ১ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা। আর কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা।

পাশাপাশি মূলধনী খাতে ব্যয় হবে ৩২ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা, খাদ্য হিসাবে ৩০৮ কোটি টাকা এবং ঋণ ও অগ্রিম খাতে ব্যয়ের লক্ষ্য হচ্ছে ৯৩৭ কোটি টাকা।

এ ব্যয় মেটাতে অনুদানসহ আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ৩৮ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বেশি ধরা হয়েছে। এছাড়া কর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রস্তাব করা হচ্ছে ৩ লাখ ৪০ হাজার ১০৩ কোটি টাকা।

এর মধ্যে এনবিআরের কর রাজস্বের পরিমাণ হচ্ছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, এনবিআর বহির্ভূত কর রাজস্বের পরিমাণ হচ্ছে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কর ব্যতীত আয় হবে ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। এছাড়া বৈদেশিক অনুদানের পরিমাণ আগামী বছরে দাঁড়াবে ৪ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা।

এদিকে বাজেট প্রস্তাবে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ (অনুদানসহ) দাঁড়াবে ১ লাখ ৪১ হাজার ২১২ কোটি টাকা। আর অনুদান ছাড়া এ ঘাটতির পরিমাণ হবে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি। তবে অন্য বছরের মতো জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যেই রাখা হয়েছে নতুন ঘাটতি বাজেট।

এ ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা।

অভ্যন্তীরণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে নেয়া হবে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। এছাড়া সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়া হবে ২৭ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য খাত থেকে নেয়া হবে ৩ হাজার কোটি টাকা।

এছাড়া নতুন বাজেটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী পালনের প্রতিফলন থাকবে। আর বেশি মনোযোগ থাকবে নির্বাচনী ইশতেহার অনুসারে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। দেশের প্রতিটা গ্রামকে শহরে রূপান্তর করার ঘোষণা থাকছে।

এতে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হবে গ্রামকে। যেখানে ইন্টারন্টে, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সব ধরনের নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেয়া হবে। আমার গ্রাম আমার শহর এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্ব থাকবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের। তবে প্রত্যেক মন্ত্রণালয়কে এ কাজে সম্পৃক্ত করা হবে।

জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম কম থাকবে। অন্যান্য পণ্যের দাম কিছুটা নিম্নমুখী থাকবে। ফলে দেশের ভেতর পণ্যের দাম বাড়বে না- এমন আশা থেকেই নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

নতুন বাজেটে ভ্যাট খাতে বড় সংস্কার হবে। ১ জুলাই থেকে বহুল আলোচিত ভ্যাট আইন কার্যকর করা হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি কার্যকর হলে আগামী বছরে রাজস্ব আয়ে গতি আসবে।

তবে নতুন আইনে কোনো পণ্যের ওপর ভ্যাট ও কর হার বাড়বে না। বরং কমতে পারে। আইনটি বাস্তবায়নে কাউকে হয়রানি ও কষ্ট দেয়া হবে না এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী নিজেই।

এছাড়া ব্যক্তিশ্রেণীর করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হবে না। কারণ এটি করলে অনেকে করের আওতার বাইরে চলে যাবেন। এছাড়া আসন্ন বাজেটে (২০১৯-২০) নতুন করে ৮০ লাখ করদাতা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হবে। বর্তমান কর দিচ্ছে এমন সংখ্যা ২০ লাখ।

এতে করের আওতায় এক কোটি লোককে আনা হবে। বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটে (২০১৯-২০) বাড়ানো হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা। প্রায় ১৩ লাখ গরীব মানুষকে নতুনভাবে এ সুরক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে।

এতে সুবিধা পাবেন প্রায় ৮৯ লাখ গরিব মানুষ। যা চলতি বাজেটে ছিল প্রায় ৭৬ লাখ। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে আগামী বাজেটে সম্ভাব্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৫ হাজার ৩২১ কোটি টাকা।

Comments

comments

এমন আরো খবর:

Web developed by: AsadZone.Com

Send this to a friend