নিবন্ধন : ডিএ নং- ৬৩২৯ || বৃহস্পতিবার , ২৪শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ৯ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২৩শে সফর, ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

আন্তন চেখভ

আন্তন চেখভ

আন্তন চেখভের মৃত্যুর ঘটনাটি পরিণত হয় সাহিত্যের ইতিহাসে এক অসামান্য দৃশ্যপটের পরম্পরায়। তাঁর মৃত্যুর পর থেকে বহুবার বর্ণিত হয়েছে ঘটনাটি। প্রতিবার নতুন করে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় বিশদ বর্ণনাসহ চেখভের শেষ সময়ের ঘটনাবলী লেখা হয়েছে। কখনো কখনো এতে যুক্ত হয়েছে কাল্পনিক খুঁটিনাটি, ফলে কিছুটা হলেও বদলে গেছে প্রকৃত তথ্য। মৃত্যুর কয়েকমাস আগে চেখভ লেখক ইভান বুনিনকে বলেছিলেন যে তাঁর ধারণা লোকে তাঁর লেখা আর সাত বছর পড়বে। বুনিনের প্রশ্ন ছিল, “সাত কেন?”

“ঠিক আছে, সাড়ে সাত”, চেখভের জবাব। “মন্দ নয়। আমি বেঁচে আছি আর বছর ছয়েক।”

বিনয়ী ও নিরহঙ্কার আন্তন চেখভ তাঁর মরণোত্তর খ্যাতির এই ব্যাপ্তির কথা কল্পনাও করতে পারেন নি। যে বছর তিনি মৃত্যুবরণ করেন, সে বছরে দ্য চেরি অরচার্ডের বিপুল সংবর্ধনা এ কথাই প্রকাশ করে যে রুশ জনগণের মনের কতটা উচ্চাসনে তিনি স্থান করে নিয়েছেন। সেই সময়ে সাহিত্য জগতের কীর্তিমান ব্যক্তিদের মধ্যে চেখভ ছিলেন দ্বিতীয়। তলস্তয়ের পরপরই ছিল তাঁর অবস্থান। কনস্ট্যান্স গার্নেট তাঁর লেখা অনুবাদ করেছেন, ফলে তিনি পেয়েছেন ইংরেজি-ভাষী পাঠক এবং জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উলফ, ক্যাথরিন ম্যান্সফিল্ডের মতো লেখকদের প্রশংসা ও শ্রদ্ধা। ১৯১০ সালে লেখা ম্যান্সফিল্ডের ‘দ্য চাইল্ড হু ওয়জ টায়ার্ড’ আর চেখভের স্লিপি’র মধ্যেকার সাদৃশ্য নিয়ে আলোচনা করেছেন উইলিয়াম এইচ নিউ তার রিডিং ম্যান্সফিল্ড ও মেটাফর অভ রিফর্ম এ। ইংল্যান্ডবাসী রুশ সমালোচক দিমিত্রি পেত্রোভিচ মার্স্কি সে দেশে চেখভের জনপ্রিয়তাকে ব্যাখ্যা করেছেন “আমরা যেটাকে বীরোচিত মূল্যবোধ বলি, প্রথাবিরূদ্ধভাবে তার সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান” এর মাধ্যমে। রুশ নন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বপ্রথম যারা চেখভের নাটকের প্রশংসা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জর্জ বার্নার্ড শ’। “রুশ পদ্ধতিতে ইংরেজদের বিষয়বস্তুর ওপর রচিত এক উদ্ভট শিল্পকর্ম”, এই ছিল তাঁর হার্টব্রেক হাউস নাটকটির উপশিরোনামা। তিনি ব্রিটিশ জমিদার এবং অনুরূপ রুশদের মধ্যেকার সাদৃশ্যও লক্ষ্য করেছেন যা চেখভের বর্ণনায় “সেই একই শোভন ও রুচিবাগীশ ব্যক্তিবর্গ, সেই একই নিরেট অন্তঃসারশূন্যতা।”

আমেরিকাতে চেখভের নাম যশ ছড়িয়ে পড়ে আরও পরে, অংশত স্তানিস্লাভস্কির সাবটেক্সট-এর ধারণাযুক্ত অভিনয় পদ্ধতির প্রভাবে। স্তানিস্লাভস্কি লিখেছেন, “প্রায়শই চেখভ তাঁর চিন্তাভাবনার প্রকাশ ঘটাতেন কথার মাধ্যমে নয়, বরং কথাবার্তার মাঝের সাময়িক বিরতির মাধ্যমে অথবা একের পর এক বাক্য-সারির মাঝে অথবা এক শব্দের কোনো জবাবের মাধ্যমে …. তাঁর সৃষ্ট চরিত্রেরা যা নিয়ে ভাবে এবং যা অনুভব করে তার প্রকাশ ঘটতে দেখা যায় না সেইসব চরিত্রের বলা কথায়।” সাবটেক্সট নির্ভর নাটকের এই ধারণা সম্প্রসারিত হয়েছে, বিশেষভাবে, নিউইয়র্কের গ্রুপ থিয়েটারের সাহায্যে। এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন ক্লিফোর্ড ওডেটস, এলিয়া কাজান এবং লি স্ট্র্যাসবার্গসহ পরবর্তী প্রজন্মের আমেরিকান নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার এবং অভিনেতাগণ। আবার পরবর্তীকালে স্ট্র্যাসবার্গের অ্যাক্টরস স্টুডিও এবং মেথড অ্যাক্টিং এর ধারণা প্রভাবিত করেছে আরও অনেক অভিনেতাকে, যাদের মধ্যে রয়েছেন মার্লোন ব্রান্ডো এবং রবার্ট ডি নিরো। ১৯৮১ সালে নাট্যকার টেনেসি উইলিয়ামস চেখভের দ্য সীগালকে ঈষৎ পরিবর্তিত করে লিখেছেন ‘দ্য নোটবুক অভ ট্রিগোরিন’।

যদিও চেখভের খ্যাতি ছিল মূলত নাট্যকার হিসেবে, তা সত্ত্বেও কিছু লেখক বিশ্বাস করেন যে তাঁর ছোটগল্পগুলোই প্রকৃতপক্ষে তাঁর মহৎ কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। রেমন্ড কারভার, চেখভের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে ‘এর‍্যান্ড’ নামের একটি গল্প লিখেছিলেন। তিনি, চেখভকে ছোট গল্প লেখকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করতেন। ছোটগল্প ও আধুনিক নাটকের পুরোধা চেখভ অমর হয়ে থাকবেন তাঁর বেশ কিছু অমর সৃষ্টির জন্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে দ্য সিগাল, আঙ্কেল ভ্যানইয়া, দ্য থ্রি সিস্টার’স, দ্য চেরি অরচার্ড উল্লেখযোগ্যভাবে বিশ্ব সাহিত্যে খ্যাতি অর্জন করেছে। তিনি ১৬টি নাটক এবং সহস্রাধিক গল্পের রচয়িতা।

১৮৬০ সালের ২৯শে জানুয়ারি দক্ষিণ রাশিয়ার আজভ সাগর সংলগ্ন বন্দরনগরী তাগানরোগে জন্মগ্রহণ করেন আন্তন চেখভ। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। চেখভের পিতা, পাভেল জেগোরোভিচ চেখভ ছিলেন ভোরোনেজ প্রদেশের একজন প্রাক্তন ভূমিদাস কৃষক। তিনি তাগানরোগে একটি ছোট দোকান চালাতেন। পাভেল চেখভ ছিলেন গির্জার ধর্মসংগীতে নেতৃত্বদানকারী গায়কবৃন্দের পরিচালক এবং একজন ধর্মপ্রাণ অর্থোডক্স খ্রিস্টান। পিতা হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও রূঢ়। তাঁর সন্তানদের তিনি এমনকি শারীরিকভাবেও শাস্তি দিতেন। গবেষকগণ মনে করেন চেখভের রচিত কপটতাপূর্ণ চরিত্রগুলো তৈরী হয়েছে তাঁর পিতার আদলে। চেকভের মায়ের নাম জেভগেনিয়া জাকোভলেভনা। মা ছিলেন চমৎকার গল্পকথক। সন্তানদেরকে তিনি গল্প বলতেন। কাপড়-ব্যবসায়ী বাবার সাথে পুরো রাশিয়া ভ্রমণের গল্প। চেখভ তাঁর মায়ের কথা স্মরণ করেছেন এভাবে, “আমরা আমাদের বাবার কাছ থেকে পেয়েছি মেধা, কিন্তু হৃদয় পেয়েছি মা’র কাছ থেকে”।

তাগানরোগের বাণিজ্যে গ্রিক ব্যবসায়ীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাই চেখভের পিতা চেখভকে ও তাঁর এক ভাই নিকোলাইকে গ্রিক স্কুলে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু স্কুলটি চলছিল অসফলভাবে এবং দুই বছর পরেই এটি পরিণত হয় তাগানরোগ শরীরচর্চা কেন্দ্রে, আর এখন একে বলা হয় “চেখভ জিমনেসিয়াম”।

স্কুলে চেখভের কৃতিত্ব ছিল গড়পড়তা মানের। পনের বছর বয়সে চেখভকে একই ক্লাসের পুনরাবৃত্তি করতে হয়েছিল, কেননা তিনি একটি গ্রিক পরীক্ষায় পাশ করতে পারেননি। এই ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে চার্চের ধর্মীয় সমবেত সঙ্গীতে এবং তাঁর পিতার দোকানের কাজে চেখভের নিয়মিত অংশগ্রহণ। এছাড়াও সমকালীন রাশিয়ার কতৃত্বপূর্ণ শিক্ষা ও শিক্ষাদান পদ্ধতিও কারণ ছিল। মোটা দাগে বলতে গেলে, চেখভ প্রভূত্বের ধারণাকে তুচ্ছজ্ঞান করতেন এবং প্রবলভাবে অপছন্দ করতেন।

১৮৭৬ সালে একটি নতুন বাড়ি তৈরিতে অনেক বেশি পুঁজি বিনিয়োগের পর চেখভের পিতাকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়। ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় কারাবাস এড়াতে তিনি মস্কোতে পালিয়ে যান। এখানেই তাঁর বড় দুই ছেলে, আলেকজান্ডার ও নিকোলাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো। পরিবারটি মস্কোতে দারিদ্র্যের মাঝে বাস করছিলো। চেখভের মা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলেন। বিষয়সম্পত্তি বিক্রি ও স্কুলের পড়াশোনা শেষ করার জন্য চেখভকে তাগানরোগেই রেখে আসা হয়েছিল। চেখভ তাগানরোগে আরও তিন বছর ছিলেন। তিনি তাগানরোগে সেলিভানভ নামের এক ব্যক্তির সাথে থাকতেন যিনি চেখভের দ্য চেরি অরচার্ড এর চরিত্র লোপাখিনের মতোই তাঁদের বাড়ি কিনে নিয়ে পরিবারটিকে ঋণমুক্ত করেছিলেন। চেখভকে নিজের পড়াশোনার ব্যয় নিজেকেই বহন করতে হতো। এই খরচের ব্যবস্থা করার জন্য তিনি বেশ কয়েক রকমের কাজ করতেন যার মধ্যে একটি ছিল গৃহশিক্ষকতা। এছাড়াও তিনি গোল্ডফিঞ্চ পাখি ধরে বিক্রি করতেন এবং খবরের কাগজে ছোট ছোট স্কেচ এঁকেও অর্থ উপার্জন করতেন। তিনি তাঁর দৈনন্দিন খরচ থেকে সঞ্চিত প্রতিটি রুবল মস্কোতে পাঠিয়ে দিতেন, সেই সাথে পরিবারের সদস্যদের উদ্দীপিত করার জন্যে পাঠাতেন হাস্যরসাত্মক চিঠি। এই সময়টিতে তিনি প্রচুর পরিমাণে পড়েছেন। পড়েছেন বিশ্লেষণাত্মকভাবে। যে লেখকদের লেখা তিনি এই সময়ে পড়েছিলেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন থের্ভান্তেস, তুর্গেনেভ, গনসারভ এবং শোপেনহাওয়ার।

চেখভ সাধারণ মানুষের কাছে যেমন গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন, জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, তেমনি বিখ্যাত সাহিত্যিকদেরও মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন তাঁর লেখার সাহিত্যগুণের জন্য। চৌষট্টি বছর বয়স্ক নামকরা প্রবীণ রুশ লেখক দিমিত্রি গ্রিগোভিচ চেখভের ছোটগল্প দ্য হান্টসম্যান পড়ে চেখভকে লিখেছিলেন, “তোমার সত্যিকারের প্রতিভা আছে – এমন এক প্রতিভা, যা তোমাকে নতুন প্রজন্মের লেখকদের সামনের সারিতে জায়গা করে দিতে পারবে।” তিনি চেখভকে লেখালেখির পরিমাণ কমিয়ে লেখার সাহিত্যমানের প্রতি মনোযোগ দেয়ার উপদেশ দেন।

দিমিত্রি গ্রিগোভিচের চিঠির প্রত্যুত্তরে চেখভ লিখেছিলেন যে এ চিঠি তাঁকে আঘাত করেছে যেন বজ্রপাতের মতো এবং স্বীকার করেছেন, “আমি আমার গল্পগুলো লিখেছি এমন ভাবে, যেমন করে প্রতিবেদকরা কোথাও আগুন লাগলে তার বিবরণ লিখেন – যান্ত্রিক, অর্ধ-সচেতন এবং পাঠক ও আমার নিজের কোনো কিছুর প্রতি কোনো গুরুত্ব না দিয়ে।” এই স্বীকারোক্তি হয়তো চেখভের জন্য ক্ষতিকর ছিল, কারণ তাঁর পূর্ববর্তী পাণ্ডুলিপিগুলো এটাই প্রকাশ করে যে তিনি বেশিরভাগ সময়েই লিখেছেন অত্যন্ত যত্নের সাথে, লেখার পরিমার্জনা করেছেন বারবার। তথাপি গ্রিগোভিচের উপদেশ ছাব্বিশ বছর বয়সের তরুণ চেখভকে আরো গভীর, শৈল্পিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ১৮৮৭ সালে গ্রিগোভিচের গোপন প্রভাবের সামান্য প্রয়োগে চেখভের ছোটগল্প সংকলন অ্যাট ডাস্ক বহু আকাঙ্ক্ষিত পুশকিন পুরস্কার জিতে নেয় “সর্বোৎকৃষ্ট সাহিত্যকর্মের জন্য, যা উচ্চ শৈল্পিক মূল্যগুণে স্বতন্ত্র।”

১৮৯৭ সালের মার্চে মস্কোতে থাকাকালীন সময়ে চেখভ ফুসফুসে রক্তক্ষরণজনিত সমস্যায় ভুগতে থাকেন। ফুসফুসের উপরের অংশে যক্ষা ধরা পড়ে। ১৮৯৮ সালে পিতার মৃত্যুর পরে চেখভ ইয়াল্টা শহরে বাগানবাড়ি তৈরি করে মা ও বোনের সঙ্গে চলে আসেন। ইয়াল্টাতে বসেই বিখ্যাত গল্প ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ডগ’ লিখেন।

বিবাহভীতিতে ভুগতে থাকা চেখভ, ১৯০১ সালের ২৫ তারিখে ওলগা নিপারকে বিয়ে করেন। তাঁর সঙ্গে চেখভের প্রথম চোখাচোখি হয় ‘দ্য সীগাল’ নাটকের মহড়ার সময়ে। চেখভ বেশির ভাগ সময়ে ইয়াল্টাতেই বাস করতেন। আর অভিনয় পেশার কারণে ওলগা থাকতেন মস্কোতে। ১৯০৪ সালের মে মাসে চেখভ প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। যক্ষা রোগের প্রকোপেই ১৯০৪ সালে ১৫ জুলাই তারিখে জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্টে তাঁর মৃত্যু হয়।

Comments

comments

এমন আরো খবর:

Web developed by: AsadZone.Com

Send this to a friend