নিবন্ধন : ডিএ নং- ৬৩২৯ || মঙ্গলবার , ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৯ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২৩শে মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

জহির রায়হান

জহির রায়হান

জহির রায়হানের সাহিত্য চর্চা ছিল প্রতিবাদে মুখর। প্রতিবাদী সাহিত্যরচনার একপর্যায়ে সেলুলয়েডকেই মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন তিনি। পরবর্তীতে চলচ্চিত্রই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান হয়ে ওঠে। ১৯৩৫ সালের ৫ আগস্ট (বিভিন্ন জায়গায় তার জন্ম তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৯ আগস্ট, কিন্তু তার বোন দাবি করেছেন জহির রায়হানের জন্ম তারিখ ৫ আগস্ট) তৎকালীন নোয়াখালি জেলার ফেনী মহকুমার অর্ন্তগত মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের পরিবারের একজন জহির রায়হান। তাঁর স্কুল জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে কলকাতায়।

 

১৯৫৩ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হলেও পরের বছর অর্থনীতি ছেড়ে বাংলায় ভর্তি হন এবং ১৯৫৮ সালে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। যদিও পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে চলচ্চিত্রের প্রতি বেশি ঝোঁক ছিলো জহির রায়হানের। এ সময়ই তাঁর সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি প্রবাহ (সম্পাদক), এক্সপ্রেস (কার্যকরী সম্পাদক), খাপছাড়া, যাত্রিক (সহকারী সম্পাদক), সিনেমা, সমকাল, চিত্রালী, সচিত্র সন্ধানী ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়, ১৯৬০ সালে তার প্রথম উপন্যাস ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ প্রকাশিত হয়। তবে চলচ্চিত্র জগতে তাঁর পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। তিনি সালাউদ্দীনের ‘যে নদী মরুপথে’ চলচ্চিত্রে সহকারি হিসেবে কাজ করেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাঁকে ‘এ দেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে কাজ করার আমন্ত্রণ জানান। এ চলচ্চিত্রের নামসঙ্গীত রচনাও করেছিলেন জহির রায়হান। ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ ছবির মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তারপর ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন। পরের বছরই তাঁর প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’ মুক্তি পায়।

 

জহির রায়হান ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। ভাষা আন্দোলন তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে। তিনি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন।

জহির রায়হান ১৯৬১ সালে নায়িকা সুমিতাদেবীর সাথে পরিণয়সূত্রে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দু’সন্তান বিপুল রায়হান ও অনল রায়হান। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে তিনি নায়িকা সুচন্দাকে বিয়ে করেন। এ পরিবারেও তার দু সন্তান – অপু রায়হান ও তপু রায়হান।

 

জহির রায়হান সব সময় তার ছবিতে নিত্য-নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতেন। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র সঙ্গম নির্মাণ করেন এবং পরের বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত বাহানা ছিল সিনেমাস্কোপে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র। ১৯৬৫ সালে জহির রায়হান তার উপন্যাস ‘আর কতদিন’ অবলম্বনে ‘Let Their Be Light’ নামে একটি ছবি করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। জহির রায়হানের ইচ্ছে ছিল, ছবিটি নির্মিত হবে ইংরেজি ভাষায় এবং ডাব করা হবে বাংলা, উর্দু, রুশ এবং ফরাসি ভাষায়। উর্দু এবং ইংরেজি সংলাপ লেখেন কবি ফয়েজ আহমেদ, রুশ সংলাপ লিখবেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রুশ ঔপন্যাসিক মিখাইল শলোকভ। জহির রায়হান এই কাজ শুরু করেন ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে। চলচ্চিত্রের মহরত অনুষ্ঠিত হয় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল-এ (বর্তমান রূপসী বাংলায়)। শুটিং শুরু হবার অল্প কিছুদিন পরেই স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। চলচ্চিত্র অসমাপ্ত রেখে তিনি চলে যান ভারতে। ৫২, ৬৯ এর মত এবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন জহির রায়হান। তবে এবার প্রতিবাদ শুরু করেন ক্যামেরার মাধ্যমে। বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দেন পাকিস্তানী বাহিনীর গণহত্যার চিত্র ধারণ করে। নির্মাণ করেন ‘Stop Genocide’। এই ছবিটির ধারা বর্ণনা করেন আরেক চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির।

 

১৯৭১ সালে কলকাতায় জীবন থেকে নেয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ ভূয়সী প্রশংসা করেন। নিজে সে সময় চরম অর্থনৈতিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও, প্রদর্শনী থেকে পাওয়া সমস্ত অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন। তার সহায়তায় নির্মিত হয় আরও দুটো তথ্যচিত্র। Innocent Million (বাবুল চৌধুরী) ও Liberation Fighters (আলমগীর কবীর)। ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরে এসে সম্পন্ন করেন তার আরেকটি তথ্যচিত্র ‘A State Is Born’-এর কাজ।

 

বিজয়ের প্রাক্কালে তাঁর বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে তুলে নিয়ে যায় আল-বদর বাহিনী। দেশে ফেরার পর থেকেই ভাইয়ের সন্ধান করতে থাকেন জহির রায়হান। ৩০শে জানুয়ারী এক ফোন পেয়ে মিরপুরে ভাইকে খুঁজতে যান জহির রায়হান। তাঁর মরিস মাইনর গাড়িটিকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেলেও জহির রায়হানের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় না। ১৯৯৯ সালে সেপ্টেম্বর জুলফিকার আলী মানিকের প্রতিবেদন “নিখোঁজ নন, গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন জহির রায়হান” প্রকাশিত হয়। সেবছর সাপ্তাহিক ২০০০-এ পুত্র অনল রায়হান “বাবার অস্থি’র সন্ধানে” নামে একটি প্রতিবেদন লিখেন। সমাধান হয় জহির রায়হান অন্তর্ধান রহস্যের। জানা যায় স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত শক্তির গুলিতে প্রাণ হারান বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এই প্রবাদ পুরুষ।

Comments

comments

এমন আরো খবর:

Web developed by: AsadZone.Com

Send this to a friend